প্রধান ওয়ায়েজীন হিসেবে তাঁকে দেখেছিলাম এক আজিমুশ্শান ওয়াজ মাহফিলের স্টেজে। প্রচুর ভক্ত অনুরক্ত তাঁর ওয়াজের ক্লিপ শেয়ার করছেন। অগণিত লাইকে পোষ্টটি গিজগিজ করছিল। গগনবিদারী চিৎকারে উপস্থিত দর্শক-স্রোতা হুজুরের ওয়াজের সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করে, ঠিক আছে…. বলে জানান দিচ্ছে।
ব্যাপারটি অত বড় কিছু না। খুবই ছোট্ট কিন্তু প্রভাব পড়ছে গভীরে। ব্যক্তি হিসেবে আমার কাছে ভাল ঠেকেনি।
প্রধান বক্তা হুজুর, গায়িকা মমতাজের ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ গানের কলি হুবহু মমতাজের সুরে নিজের কণ্ঠে নকল করে, উপস্থিত মাহফিলে কিছুটা শুনিয়ে দিলেন! তারপর স্রোতাদের লক্ষ্যে প্রশ্ন ছুড়ে মারলেন এই গান বাজারে আছে কি নাই? অতঃপর যথারীতি আরেকটি গানের কলিও শুনালেন এবং আবারো সেই প্রশ্ন আছে কি নাই? সমস্বরে জবাব দিল আছে….। তিনি উত্তর দিলেন একারণেই সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এভাবে বুক ফেটে ফালা ফালা হয়ে গেলেও শেষ পরিণতিতে সবাইকে জাহান্নামেই যেতে হবে!!!
আমারা প্রশ্নটা এখানেই! দেখুন, এই গানের কথাগুলো হুজুর গভীর চিন্তায় মুখস্থ করেছেন এবং স্বয়ং নিজে মন-প্রাণ খুলে সূর শিখেছেন, তারপর নিজেও গেয়ে দেখেছেন শুনতে কেমন লাগে। সেই তিনি ওয়াজ মাহফিলে বক্তা হিসেবে হাজির হয়ে, নিজের গলা সুন্দর এটা প্রকাশার্তেই মমতাজের গান শুনিয়ে, উপস্থিত স্রোতাদের নিকট থেকে ভিন্ন ধরনের অভিব্যক্তি আদায় করলেন। যদিও গানের কথার সাথে ওয়াজের কোন সম্পর্ক নাই। তিনি এ ধরনের গান গেয়ে বুঝিয়ে দিলেন, ঘরে যখন একাকী একান্তে থাকেন, তিনি কদাচিৎ এ ধরনের গানের প্র্যাকটিস করেন! শুধু তাই নয়, তাঁর উপস্থিত স্রোতাদের থেকেও সাক্ষ্য আদায় করলেন এই বলে যে, জনপ্রিয় এই গানটি তারাও শুনেন কিংবা শুনেছেন। আমি কিন্তু সেই দরবারী হুজুরের কথা বলছিনা, যিনি ফোক গায়িকা, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান, বাউল আর লালনের গান মুখস্থ করে, সেই সব গানের সূর দিয়েই আবার নাতে রাসুল গায়! মহা সওয়াবের নাতে রাসুল যেহেতু গাইতেই হবে, তাহলে বাজে গানের নান্দনিক সূর চুরি করতে অসুবিধা কোথায়? ইনি, নামকরা মাদ্রাসার ছাত্র, বড় ডিগ্রী আছে, তাই তো তিনি মাহফিলের প্রধান বক্তা। যাক, মূল কথায় আসি,
গায়িকা মমতাজ লেখাপড়াই করেনি; তবুও তিনি, এ দেশের মানুষের নাড়ির টান, চেতনা, ইচ্ছা, অভিলাষ, অভিপ্রায় সহজে বুঝতে পারেন। কুলি, মজুর, দিন-কামলা, খেটে খাওয়া মানুষদের জীবন দর্শন ভালই বুঝেন। তাই তিনি সেটা মাথায় রেখে গান বানান। আর সে গান সহজেই বাজার মাতিয়ে তুলে। এমনকি তিনি তার গান দিয়ে, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদকে মাতিয়ে তোলার দক্ষতা দেখিয়েছেন! এই কথা আমার আপনার পছন্দ হউক বা না হউক তাতে কিছু আসে যায় না কিন্তু এটাই নিরেট বাস্তবতা। গায়িকার পক্ষে এটা এই কারণেই সম্ভব হয়েছে যে, তিনি বাংলাদেশের মানুষদের জীবন দর্শন ও সংস্কৃতির চাহিদা মাত্রা অনুযায়ী বুঝতে পেরেছেন। তাই তিনি অনেক সাধারণ মানুষদের মনে অবিরত ছক্কা হাঁকাচ্ছেন।
আমরা যারা উপরে আলেমে দ্বীনের মত ওয়াজ-নসিহত করছি; আমরা কি আমাদের বাস্তব সমাজ, সংস্কৃতির টান সম্পর্কে ধারণা রাখি? আমরা কি গণ-মানুষের মনের কথা বুঝি? তারাও কি আমাদের সেভাবে গ্রহণ করে কিংবা সমাজ গঠনের পরামর্শ আশা করে! সত্য কথা, বরাবরই না হবে! সে কারণে মানুষ যা আশা করে তার মত করে তাকে সে জ্ঞান দেওয়া যাচ্ছেনা। আবার আমরা যা বলছি, তা মানুষ শোনার জন্য নিজের পকেটের টাকা খরচ করেও মাহফিলে আসেনা। ফলে উপস্থিত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য, তাদের কাছে যা জনপ্রিয় সে ধরণের একটি বাক্য হাজির করে নিজের কথা উপস্থাপন করছি। জানিনা এ ধরনের ওয়াজে মুমিন ব্যক্তির কি কল্যাণ লাভ হবে।
আলেম শব্দের অর্থই ব্যাপক। সকল ধরণের জ্ঞানেই তিনি ভরা থাকবেন। একজন আলেম অবশ্যই কোন গানের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলতে পারেন। তাই বলে নিজের কণ্ঠে একটি গানের কিছু অংশ গেয়েই শোনাতে হবে? তা হলে তো প্রমাণ হয়ে যায়, গায়িকাই সেরা। কেননা তার গান ইসলামী জলসায় চুল ছেরা বিশ্লেষণ হয়। হউক তা ভাল না হয় মন্দ। যাই হউক এ ব্যাপারে সবার আরো বেশী সচেতন হওয়া খুবই জরুরী। নতুবা পরবর্তী ওয়ায়েজীনেরা মাহফিলকে গানের অনুষ্ঠানে পরিণত করবে। ইতিমধ্যে যার আলামত ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

Discussion about this post