Tipu vai
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি
No Result
View All Result
নজরুল ইসলাম টিপু
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি
No Result
View All Result
নজরুল ইসলাম টিপু
No Result
View All Result

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল আশশায়বানী (রহঃ)

প্রথম খন্ড

জুলাই ২৪, ২০২০
in জীবনী
8 min read
0

ইমাম আবু আব্দিল্লাহ আহমদ বিন মুহাম্মদ হাম্বল বিন হেলাল বিন আসাদ বিন ইদ্রীস বিন আব্দিল্লাহ বিন হাইয়ান বিন আব্দিল্লাহ বিন আনাস বিন আউফ বিন কাসেত বিন মাযেন বিন শায়বানী বিন যাহল বিন ছালাবা বিন ইকাবা বিন ছাব বিন আলী বিন বকর বিন ওয়ায়েল আশশায়বানী, আল মারওয়াযী আল বাগদাদী (রহঃ)। সংক্ষেপে আহমদ বিন হাম্বল আশশায়বানী। ১৪ হিজরীতে হযরত উমর (রাঃ)-এর নির্দেশ এবং পরামর্শে বছরায় বসতি স্থাপন করা হয়। এখানে আরবের বিভিন্ন গোত্র বাস করতে থাকে। এদের মধ্যে বনী শায়বান বিন যহলের একটি শাখা বনু মাযেনও ছিল। এ উপগোত্রের সাথেই ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের গোত্রীয় সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বছরায় গমন করলে তাদের গোত্রীয় মসজিদেই অধিকাংশ সময় নামায পড়তেন। 

আব্দুল্লাহ বিন রুমী বর্ণনা করেন, আমি বছরায় অধিকাংশ সময়েই দেখতাম যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বনী মাযেনের মসজিদে আসতেন এবং নামায পড়তেন। একবার আমি তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটা আমার পূর্ব পুরুষদের মসজিদ।

খোরাসান বিজয়ের পর সেখানকার মারভ শহরে যখন অনেক আরব গোত্র বসতি স্থাপন করে এবং সেখানে তাদেরকে অনেক জায়গীর এবং যমীন দেয়া হয় তখন ইমাম সাহেবের পরিবারও মারভ শহরে বসতি স্থাপন করে সেখানে বসবাস করতে থাকে। আবু যুরআ রাযী বর্ণনা করেন-

আহমদ বিন হাম্বল মূলতঃ বছরার। মারভে তার জমি এবং বাড়ী ছিল। ইমাম সাহেবের দাদা হাম্বল বিন হেলাল সরখসের’ আমীর এবং হাকেম ছিলেন। তৎকালীন রাজনীতিতে তার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। একবার বোখারার আমীর মুসাইয়্যেব বিন যুহাইর তাকে এবং আবুন্নাজম ইসহাক বিন ঈসা সাদীকে শাস্তি দেন। কারণ তারা ষড়যন্ত্র করে সৈন্যদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে দিয়েছিল।

ইমাম সাহেবের মাতাও বনী শাইবান গোত্রের। তার নাম ছফিয়্যা বিনতে মায়মুন বিনতে আব্দিল মালেক শায়বানী। তার নানা আব্দুল মালেক বিন সওয়াদা বিন হিন্দ শাইবানী গোত্রের সম্মানী এবং মর্যাদাশীল ব্যক্তি ছিলেন। মারভে তাদের নিকট আরবের গোত্র আসত। তিনি তাদেরকে দাওয়াত করতেন। এবং আপ্যায়ন করতেন। ইমাম সাহেবের পিতা তার ওখানে থাকতেন। পরে তার কন্যাকে বিবাহ করেন।

তার সম্পর্কে কিতাবে ‘জুনদী’ (সৈন্য) এবং কায়েদ (নেতা) উল্লেখ রয়েছে। এতে বুঝা যায় তিনি কোথাও কোন সেনাদলের অধিনায়ক ছিলেন।

জন্ম এবং বাল্যকাল

ইমাম সাহেবের পিতা কোন কারণে ১৬৪ হিজরীতে মারভ ত্যাগ করে বাগদাদ আগমন করেন। তখন ইমাম সাহেব মাতৃগর্ভে ছিলেন। ১৬৪ হিজরীতে রবীউল আউয়াল মাসে তার জন্ম হয়। বাগদাদ আগমনের কিছুদিন পরই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে পিতার বয়স ছিল ৩০ বৎসর। ইমাম সাহেব তখন ছোট শিশু ছিলেন। তিনি বলেন, আমি আমার পিতাকে দেখিনি, দাদাকেও দেখিনি। আমার মা আমাকে প্রতিপালন করেছেন।

মা তার এ পিতৃহীন শিশুকে অতি যত্ন সহকারে আদর-স্নেহ দিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা দেন। বালকও তার মার প্রতি খুবই সম্মান দেখিয়ে চলত। ১৮৬ হিজরীতে দজলা নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়। তখন ইমাম সাহেবের বয়স বাইশ বৎসর। এ সময় ‘রায়’ এর মুহাদ্দিছ জরীর বিন আব্দিল্লাহ বাগদাদ আগমন করেন। ইমাম সাহেবের সঙ্গী হাদীছ রেওয়ায়েতের জন্য এ অবস্থাতেও তার নিকট গেলেন। কিন্তু ইমাম সাহেব যেতে পারেননি। কারণ তার মা তাকে অনুমতি দেননি। তদ্রুপ ভোরের অন্ধকারে ইমাম সাহেব কোন মুহাদ্দিছের কাছে যেতে চাইলে তার মা তাকে অধিক স্নেহ এবং ভালবাসার কারণে যেতে দিতেন। তিনি স্বয়ং বর্ণনা করেন-

‘অনেক সময় আমি অতি ভোরে হাদীছ পড়তে যেতে চাইতাম। কিন্তু আমার মা আমার কাপড় ধরে বলতেন, ভোর হতে দাও। অনেক সময় আমি অতি ভোরে আবু বকর বিন আইয়াম এবং অন্যান্যদের দরসী মজলিসে যেতাম।’

এ বর্ণনা থেকে বুঝা যায় ইমাম সাহেবের মা দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন এবং আপন ছেলেকে অতি সোহাগ করে শিক্ষা দিয়েছেন এবং লালন-পালন করেছেন।

প্রাথমিক শিক্ষা

বাল্যকাল থেকে ইমাম সাহেব মকতবে শিক্ষা শুরু করেন। সে সময় থেকেই তার ভদ্রতা, সততা, বুযুর্গী প্রসিদ্ধ ছিল। আবু আকীব রাবী বলেন,

আহমদ বিন হাম্বল মকতবে আমাদের সাথে ছিলেন তখন তিনি খুবই ছোট ছিলেন। আমরা তার বুযুর্গী সম্পর্কে অবগত ছিলাম।

ঐ সময় খলীফা বাগদাদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের সাথে রক্কা নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। তারা বাড়ীতে চিঠি লিখতেন। তাদের স্ত্রীরা মকতবের মু’আল্লিমের নিকট খবর পাঠাতেন যে, আহমদ বিন হাম্বলকে পাঠিয়ে দিন। সে আমাদের চিঠির উত্তর লিখে দিবে। তিনি মাথা নীচু করে বাড়ী যেতেন এবং তাদের চিঠি লিখে দিতেন। কখনও কোন অসমীচীন কথা হলে তা তিনি লিখতেন না।

একবার জনৈক আমীর ইমাম সাহেবের চাচার নিকট চিঠি লিখলেন। তিনি সেটার উত্তর লিখে ইমাম সাহেবের নিকট দিয়ে বললেন, বার্তাবাহক এলে দিয়ে দিও। বার্তাবাহক এসে চিঠির উত্তর চাইলে তার চাচা বললেন, আমি উত্তর লিখে আহমদকে দিয়েছিলাম। সম্ভবতঃ সে তোমাকে দিয়ে দিয়েছে। এরপর ইমাম সাহেবকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এতে অমুক কথাটি অসমীচীন ছিল। এজন্য আমি তাকের উপর রেখে দিয়েছি।

খলীফা রক্কা অবস্থানকালে দাউদ বিন বুসতাম ইমাম সাহেবের চাচার নিকট লিখলেন, আজকাল বাগদাদের সংবাদ পাচ্ছি না। আমি খলীফার সামনে তা পেশ করতে চাই। তিনি তার উত্তর লিখে ইমাম সাহেবকে দিলেন (কিন্তু তিনি সে চিঠি দেননি) পরে যখন তাকে ডেকে জানতে চাইলেন তিনি বললেন, এমন খবর আমি সেখানে পৌঁছাব? সে চিঠি আমি পানিতে ফেলে দিয়েছি। ইবনে বুসতামের নিকট এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বললেন,”এ ছেলেটি মুত্তাকী হবে, আমরা কি হব”?

আবু সিরাজ বলেন, আমার পিতা আহমদ বিন হাম্বলের সৎ-চরিত্র এবং প্রকৃতি দেখে আশ্চর্য হয়ে বলতেন, আমি আমার ছেলেদের শিক্ষা দীক্ষার জন্য অনেক সম্পদ ব্যয় করেছি। তাদের জন্য মুআল্লিম এবং মুআদ্দিব নিযুক্ত করেছি যেন তারা আদব শিখে। কিন্তু তাদের সফলতা দেখছি না। অথচ এ আহমদ বিন হাম্বলকে দেখ, এ পিতৃহীন ছেলেটি কত সুন্দরভাবে চলছে।

হাদীছ শিক্ষা এবং শিক্ষা সফর

প্রাথমিক শিক্ষার পর ইমাম সাহেব ১৬ বৎসর বয়সে হাদীছ শিক্ষা আরম্ভ করেন। এ বিষয়ে তাঁর সর্ব প্রথম শায়খ হচ্ছেন কাযী আবু ইউসুফ (রহঃ)। তিনি বলেন

‘আমি সর্বপ্রথম আবু ইউসুফ থেকে হাদীছ লিখি’।

ইমাম সাহেব বর্ণনা করেন, যখন আমরা কাযী আবু ইউসুফের (রহঃ) দরসী মজলিসে যেতাম তখন বিশর মুরাইসী এসে সবার পিছনে বসে যেতেন এবং সেখান থেকে চিৎকার শুরু করতেন এবং বলতেন আবু ইউসুফ! এটা কি বলছ? এভাবে সবসময় চীৎকার করে চলতেন। আর আবু ইউসুফ ছাত্রদেরকে বলতেন একে আমার নিকট নিয়ে এস। একদিন বিশর মুরাইসী এসে আগের মত চীৎকার আরম্ভ করলেন। আবু ইউসুফ তাকে ডেকে নিজের কাছে নিলেন। আমি তাদের নিকটেই বসা ছিলাম। বিশর মুরাইসী একটি মাসয়ালা নিয়ে আবু ইউসুফের সাথে আলোচনা শুরু করলেন। কিন্তু আমি উভয়ের কথা পুরোপুরি শুনতে পাইনি। তাই পাশে বসা সাথীকে জিজ্ঞেস করলাম, আবু ইউসুফ বিশর মুরাইসীকে কি বলছেন? সে বলল, আবু ইউসুফ বলছেন যে, আপনি কাঠে অগ্নি সংযোগ করার পরই মানবেন।

ইমাম সাহেব বাগদাদের শায়খ এবং মুহাদ্দিছীনদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ শেষে বছরা, মক্কা, মদীনা, ইয়ামান, সিরিয়া, জযীরা, আবাদানী প্রভৃতি দেশ সফর করেন এবং সেখানকার শায়খদের নিকট থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন।

ইমাম সাহেবের শিক্ষা ভ্রমণ সম্পর্কে তাঁর পুত্র শাগরেদরা স্বয়ং তাঁর নিজের বক্তব্যই বর্ণনা করেছেন। তারই সার সংক্ষেপ উল্লেখ করা হচ্ছে। ইমাম সাহেব বলেন, আমি ১৭৯ হিজরীতে আলী বিন হাশেম বিন বরীদ থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছি। এটা ছিল আমার হাদীছ শিক্ষার প্রথম বৎসর। ঐ বৎসরই হুশাইম বিন বশীর থেকে প্রথমবার হাদীছ শবণ করি। সে বৎসরই আব্দুল্লাহ বিন মুবারক শেষবারের মত বাগদাদ আসেন। আমি তাঁর শিক্ষা মজলিসে গিয়ে জানতে পারলাম তিনি তরসুস চলে গেছেন। ১৮১ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করেন। ঐ সময় আমার বয়স ছিল ১৬। আর হুশাইম বিন বশীরের ইন্তেকালের সময় আমার বয়স ছিল ২০ বৎসর। ঐ বৎসরই হাম্মাদ বিন যায়েদ এবং মালেক বিন আনাস ইন্তেকাল করেন। হুশাইমের মজলিসে আমি ১৮৩ হিজরী পর্যন্ত ছিলাম। সে বৎসরই তিনি ইন্তেকাল করেন। আমি তার নিকট থেকে ‘কিতাবুল হজ্জ’ লিখেছি। যাতে এক হাজার হাদীছ ছিল। এছাড়াও কিতাবুল কালা, তফসীর সম্বন্ধীয় কিতাব এবং আরো কয়েকটি ছোট ছোট কিতাব লিখেছি। এতে প্রায় তিন হাজার হাদীছ সংগ্রহ করেছি। হুশাইম আমাদেরকে কিতাবুল জানায়েয শিখাচ্ছিলেন। এর মাঝেই হাম্মাদ বিন যায়দের মৃত্যুর খবর পৌছে গেল। হুশাইমের ইন্তেকালের পূর্বে আমি আব্দুল মুমেন বিন আব্দিল্লাহ বিন খালেদ ঈসা থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছি। ১৮২ হিজরীতে আমি রায় এর আলেম আবু মুজাহিদ আলী বিন মুজাহিদ কাবুলী থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেছি। সে বৎসরই আমি রায় সফর করেছিলাম। ১৮৬ হিজরীতে আমি বছরায় প্রথম সফর করি। ১৮৭ হিজরীতে মক্কা মুকাররমায় সুফিয়ান বিন উয়াইনার খিদমতে উপস্থিত হই। আমাদের মক্কায় পৌঁছার কিছুদিন পূর্বে ফুযাইল বিন আয়ায মৃত্যুবরণ করেন।

ঐ বৎসরই প্রথম বারের মত হজ্জ পালন করি। ইব্রাহীম বিন সাদ থেকেও হাদীছ লিখেছি। তার পিছনে কয়েকবার নামাযও পড়েছি। ১৮৬ হিজরীর শেষ দশদিনে আমি আবাদান গিয়েছি। ঐ বৎসরই মুতামার বিন সুলাইমানের নিকট গিয়েছি। আমরা ১৯৮ হিজরীতে ইয়ামানে আব্দুর রায্যাকের নিকট ছিলাম। সেখান থেকেই সুফিয়ান বিন উয়াইনা, আব্দুর রহমান বিন মাহদী এবং ইয়াহয়া বিন সায়ীদ কাত্তানের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। ১৯৪ হিজরীতে বছরায় সুলাইমান বিন হরব, আবুন নোমান আরেম, আবু উমর হাউযী থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছি। আমার নিকট যদি পঞ্চাশটি দেরহাম থাকত তবে আমি রায়’ ব্রজরীর বিন আব্দিল্লাহর নিকট যেতাম। আমার কোন কোন সাথী গিয়েছে কিন্তু আমি যেতে পারিনি। পরে কুফায় গেলাম। সেখানে এমন বাড়ীতে অবস্থান করলাম, যেখানে বালিশ হিসেবে ইট ব্যবহার করতে হয়েছে। সেখানে কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হলে মায়ের নিকট ফিরে এলাম। মায়ের অনুমতি ছাড়াই আমি কূফা গিয়েছিলাম। আমি সর্বমোট পাঁচবার কুফা গিয়েছি। প্রথমবার ১৮৬ হিজরীর রজব মাসে। সেখানে মুতামার বিন সুলাইমান থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছি। ১৯০ হিজরীতে দ্বিতীয়বার এবং ১৯৫ হিজরীতে তৃতীয়বার সেখানে গিয়েছি। তখন ‘গুনদুর’ এর ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছিল। তাই ইয়াহুয়া বিন সায়ীদের নিকট ছয়মাস অবস্থান করলাম। তার এখান থেকে ‘ওয়াসেতে ইয়াযীদ বিন হারুনের খিদমতে পৌঁছলাম। তিনি যখন জানতে পারলেন যে আমি ইয়াযীদ বিন হারুনের নিকট গিয়েছি, তখন বললেন, সে ওয়াসেতে ইয়াযীদ বিন হারুনের নিকট গিয়ে কি করবে? উদ্দেশ্য এই যে, আহমদ বিন হাম্বল ইয়াযীদ বিন হারুন থেকে বড় আলেম।

ইব্রাহীম বিন হাশেম বর্ণনা করেন, জরীর বিন আব্দিল হামীদ ‘রায়’ হতে বাগদাদ আগমন করেন এবং বনী মুসাইয়েবে অবস্থান করেন। সেখান থেকে যখন পূর্ব বাগদাদে আসেন তখন দজলা নদীতে বড় ভয়াবহ বন্যা হয়ে গেল।

আমি আহমদ বিন হাম্বলকে বললাম, চলুন, আমরাও পাড়ে গিয়ে হাদীছ শ্রবণ করে আসি। তিনি বললেন, আমার মা আমাকে অনুমতি দিচ্ছেন না। আমি একা গিয়ে জরীর বিন আব্দিল হামীদ থেকে হাদীছ পড়েছি। এ বন্যা হয়েছিল ১৮৬ হিজরীতে। ঐ সময় হারুনুর রশীদের পক্ষ থেকে বাগদাদের হাকেম। ছিলেন সিন্ধী বিন শাহেক। তিনি দজলা পারাপার বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন আবি ইসরাঈল বলেন, আমার পিতা এবং আহমদ বিন হাম্বল সমুদ্র পথে শিক্ষা সফর করেন। সমুদ্রে নৌকা ভেঙ্গে গেলে তারা একটি দ্বীপে আশ্রয় নেন।

পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমার পিতা পায়ে হেঁটে ‘তরসুস’ সফর করেন।

ইমাম সাহেব বলেন, ইয়ামানে আমি ইব্রাহীম বিন উকাইল এর নিকট গেলাম। তিনি কঠোর মেযাজী ছিলেন। তার নিকট পর্যন্ত পৌঁছা বড়ই কঠিন ছিল। তার দরজায় দু’একদিন পড়ে থেকে তার নিকট পৌঁছতে পেরেছি। তিনি আমাকে দুটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। অথচ তার নিকট ওহব বিন মুনাব্বেহ-এর বর্ণিত জাবের বিন আব্দিল্লাহ (রাঃ)-এর অনেক হাদীছ ছিল। কিন্তু তার কঠোর মেযাজের কারণে সেগুলো তার নিকট থেকেও শুনতে পারিনি। তার শাগরেদ ইসমাঈল বিন আব্দিল করীম থেকেও শুনতে পাইনি। কারণ ইব্রাহীম বিন উকাইল তখনও জীবিত ছিলেন।

খশনাম বিন সাদ একবার ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া কি ইমাম ছিলেন? তিনি বললেন, আমার মতে তিনি ইমাম ছিলেন। যদি আমার নিকট সফরের খরচ থাকত তবে আমি তার নিকট গিয়ে আসতাম।

শিক্ষা জীবনে বাধা-বিপত্তি ও অভাব-অনটন

আহমদ বিন ইব্রাহীম দাওরাকী বর্ণনা করেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) যখন আব্দুর রাযযাক থেকে হাদীছ শিক্ষা শেষে ইয়ামান থেকে মক্কায় আগমন করেন, তাঁকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। আমি তাকে বললাম, আবু আব্দিল্লাহ! আপনাকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সফরে বেশ কষ্ট সইতে হয়েছে নিশ্চয়। তিনি বললেন, আব্দুর রায্যাক থেকে যে জ্ঞান অর্জন করেছি তার তুলনায় কোন কষ্টই হয়নি। আমরা তার নিকট থেকে এ দুটি সনদে হাদীছ শ্রবণ করেছি। প্রথমটি এরূপ,

যুহরী সালেম হতে। সালেম আপন পিতা আব্দুল্লাহ হতে,

দ্বিতীয়টি হচ্ছে

যুহরী সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব হতে, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে,

একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং ইয়াহইয়া বিন ময়ীন একসাথে হজ্জ করতে গেলেন। ইমাম সাহেব ইয়াহইয়া বিন ময়ীনকে বললেন, ইনশাআল্লাহ; হজ্জ শেষে আমরা ছানআ গিয়ে আব্দুর রাযযাক থেকে হাদীছ শ্রবণ করব। এরপরে তারা তওয়াফ করছিলেন। ঘটনাক্রমে সেখানে আব্দুর রাযযাকও তওয়াফ করছিলেন। ইয়াহইয়া বিন ময়ীন তাকে দেখেই চিনে ফেললেন। কারণ পূর্ব থেকেই তাদের পরস্পরে পরিচয় ছিল। আব্দুর রাযযাক তওয়াফ এবং নামায শেষে মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে গিয়ে বসলেন।

তারাও তওয়াফ এবং নামায শেষ করলেন। পরে ইয়াহইয়া বিন ময়ীন ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে নিয়ে আব্দুর রাযাকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, এ হচ্ছে আপনার ভাই আহমদ বিন হাম্বল। তিনি বললেন, (এর সম্পর্কে আমি অনেক ভাল কথা শুনেছি) আমি এর অনেক প্রশংসা শুনেছি। ইবনে ময়ীন বললেন, ইনশাআল্লাহ আমরা আগামীকাল আপনার নিকট গিয়ে হাদীছ শ্রবণ করব। এরপর আব্দুর রাযযাক চলে গেলেন। আহমদ বিন হাম্বল বললেন, আপনি তাঁর সাথে ওয়াদা করে ফেললেন কেন? তিনি বললেন, আমরা তার নিকট থেকে হাদীছ শুনব। এতে আপনার ছনআ পর্যন্ত আসা-যাওয়ার দু মাস সময়ও বেঁচে যাবে। সফরের খরচও বেঁচে যাবে। আহমদ বিন হাম্বল বললেন, আল্লাহ এমন না করুন যে, আমি যে নিয়ত করেছি তা আপনার কথায় নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা তার নিকট গিয়ে হাদীছ শুনব।

পরে হজ্জ পালন শেষে ইমাম সাহেব ছনআ গিয়ে আব্দুর রায্যাক থেকে হাদীছ পড়েন। অথচ এ সময়ে তার আর্থিক অনটন চলছিল।

ইসহাক বিন রাহওয়ে বলেন, ইমাম সাহেব ছনআ যাওয়ার পথে তাঁর রাহা খরচ শেষ হয়ে গেলে তিনি উষ্ট্র চালকদের মযদুরী করে রাহা খরচের ব্যবস্থা করেন।

আব্দুর রাযযাক বলেন, আহমদ বিন হাম্বল আমাদের এখানে দু’বৎসর ছিলেন। ঐ সময়ে তিনি খুবই অভাব-অনটনে ছিলেন। তাই তাকে একদিন বললাম, হে আবু আব্দিল্লাহ! আমাদের দেশে (ইয়ামানে).ব্যবসাও সুবিধাজনক নয়; দেশটাও তত উন্নত নয়। তাই অর্থ উপার্জন একটু কষ্টসাধ্য। আমার নিকট কিছু দীনার আছে সেগুলো কবুল করুন। কিন্তু তিনি তা নিলেন না। এ ঘটনা মনে করে আব্দুর রায্যাক প্রায়ই কাঁদতেন।

ওয়াসেতে ইমাম সাহেব ইয়াযীদ বিন হারুনের নিকট অবস্থানকালে আর্থিক অনটনের সম্মুখীন হন। তখন ছিল পূর্ণ শীতকাল। ইমাম সাহেব তার জুব্বাটি খুলে বিক্রয়ের জন্য তার এক সাথীর নিকট দিলেন। তিনি তা ইয়াযীদ বিন হারুনের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে বললে তিনি ইমাম সাহেবের নিকট দু’শ দিরহাম পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু ইমাম সাহেব তা গ্রহণ করলেন না। বললেন আমি অভাবগ্রস্ত মুসাফির বটে; কিন্তু এভাবে দান বা হাদিয়া গ্রহণে অভ্যস্ত হতে চাই না।

মক্কা মুকাররমায় সুফিয়ান বিন উয়াইনার নিকট থেকে হাদীছ শিক্ষা গ্রহণ করার সময় একবার তাঁর কাপড়-চোপড় চুরি হয়ে যায়। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর এ সবকিছু চুরি হয়ে গেছে। তখন শুধুমাত্র হাদীছ লিখিত কাগজগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল, সেগুলো তাকের উপর সযত্নে রাখা আছে। এ ঘটনার পর কয়েকদিন পর্যন্ত তিনি দরসে উপস্থিত হননি। কারণ তাঁর পরনে দুটি পুরাতন কাপড় ছিল যা পরিধান করে মজলিসে আসার অনুপযোগী। পরে জনৈক সাথী থেকে একটি দীনার ধার নিয়ে কাপড় ক্রয় করলেন।

আমরণ শিক্ষা

ইমাম সাহেব তাঁর জ্ঞান-গরিমায় প্রসিদ্ধির চুড়ান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সর্বত্র তাঁর মহত্ব এবং ব্যক্তিত্বের আলোচনা হচ্ছিল। একদিন তিনি জনৈক মুহাদ্দিছের মজলিসে যাচ্ছিলেন। তাঁর হাতে দোয়াত ছিল। তা দেখে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, আবু আব্দিল্লাহ! আপনি জ্ঞানের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন এবং আপনি মুসলমানদের ইমাম। এরপরও পড়তে যাচ্ছেন। তিনি বললেন,

‘কবর পর্যন্ত পড়ে যাব’।

মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল ছায়েগ বলেন, একবার আমি বাগদাদ গেলাম। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) কে দেখতে পেলাম যে, তিনি জুতা হাতে নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন। আমার পিতা আগে বেড়ে তার কাপড় আঁকড়ে ধরে বললেন, আবু আব্দিল্লাহ! কতদিন পর্যন্ত আর পড়ালেখা করবেন’? এ বালকদের সাথে দৌডুতে কি আপনার লজ্জা লাগে না। উত্তরে তিনি ‘ইলাল মাউত’ তথা মৃত্যু পর্যন্ত বলে চলে গেলেন।

ওকী বিন জাররাহ রাত্রে ইমাম সাহেবের বাড়ী এসে হাদীছ সম্পর্কে আলোচনা করতেন। একরাত্রে ওকী ইমাম সাহেবের বাড়ী এসে দরজার দু’কপাট ধরে দাঁড়ালেন। ভিতর থেকে ইমাম সাহেব এসে হাদীছের আলোচনা শুরু করলেন। ওকী বিন জাররাহ বললেন, আমি আপনার সামনে সুফিয়ান বিন উয়াইনার হাদীছ বর্ণনা করছি। ইমাম সাহেব বললেন, বর্ণনা করুন। এরপর ওকী এ সনদে হাদীছ বর্ণনা করলেন, সুফিয়ান হতে, তিনি সালমা বিন কুহাইল হতে। ইমাম সাহেব বললেন, এ হাদীছগুলোতো আমার মুখস্ত আছে। এরপর ওকীকে জিজ্ঞেস করলেন, সালমা বিন কুহাইলের হাদীছ আপনার মুখস্ত আছে?

এভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে হাদীছের দুই শিক্ষার্থী সারারাত কাটিয়ে দিলেন।

হাদীছের উপর আমল

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) শিক্ষা জীবনে যত হাদীছ লিখতেন তার প্রতিটি হাদীছ অনুযায়ী আমল করতেন। তিনি যখন হাদীছে জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিংগা লাগিয়েছেন এবং এর জন্য ক্ষৌরকার আবু তাইবাকে একটি দীনার দিয়েছেন। তিনিও দেহে শিংগে পোচার করেন এবং ক্ষৌরকারকে এর বিনিময়ে একটি দীনার প্রদান করেন।

শিক্ষকদের দৃষ্টিতে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) যখন ইসমাঈল বিন উলাইয়্যার নিকট পড়তে যান তখন তাঁর বয়স ছিল তিরিশেরও নীচে। ইবনে উলাইয়্যার পরিবার পরিজন এ সময়েও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত এবং তার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখত।

একবার উলাইয়্যার দরসী মজলিসে কোন এক ছাত্রের কথায় সবাই হেসে উঠল। উক্ত মজলিসে ইমাম সাহেব উপস্থিত ছিলেন। ইবনে উলাইয়্যা ছাত্রদের উপর খুব রাগান্বিত হয়ে, বললেন, এখানে আহমদ বিন হাম্বল উপস্থিত রয়েছে। আর তোমরা হাসছ। 

ইমাম সাহেব যখন-ইয়াযীদ বিন হারুনের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে যান তখন তিনি ইমাম সাহেবকে খুবই সম্মান দেখাতেন। একবার ইমাম সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তাকে দেখতে যান।

একদিন ইয়াযীদ বিন হারুন দরসী মজলিসে হাসি কৌতুকের কোন একটি কথা বললেন। ইমাম সাহেবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কাশি দিলেন। ইয়াযীদ বিন হারুন জিজ্ঞেস করলেন, কে? উপস্থিত ব্যক্তিরা বলল, আহমদ বিন হাম্বল। তিনি বললেন, আহমদ বিন হাম্বল উপস্থিত আছে জানলে আমি হাসির কথা বলতাম না।

ইমাম সাহেবের শায়খ ও উস্তাদবর্গ

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) তাঁর নিজ শহর বাগদাদের উলামায়ে কিরাম এবং মুহাদ্দিছীনদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর শিক্ষার্থে বিভিন্ন দেশে সফর করেন। তিনি কুফা, বছরা, মক্কা, মদীনা, ইয়ামান, সিরিয়া, জযীরা, আবাদান, ওয়াসেত প্রভৃতি দেশ সফর করে সেখানকার উলামায়ে কিরাম এবং মুহাদ্দিছীনদের নিকট থেকে হাদীছ শিক্ষা লাভ করেন। এঁদের সংখ্যা অনেক। খতীব বাগদাদী তার প্রসিদ্ধ কিতাব তারিখে বাগদাদ-এ ইমাম সাহেবের নিম্নলিখিত শায়খদের নাম উল্লেখ করেছেন।

ইসমাঈল বিন উলাইয়্যা, হুশাইম বিন বশীর, হাম্মাদ বিন খালেদ খাইয়্যাত, মনছুর বিন সালমা খুযায়ী, মুযাফফর বিন মুদরিক, উছমান বিন উমর বিন ফারেস, আবুন নযর হাশেম বিন কাসেম, আবু সায়ীদ মাওলা বনী হাশেম, মুহাম্মদ বিন ইয়াযীদ ওয়াসেতী, ইয়াযীদ বিন হারুন ওয়াসেতী। মুহাম্মদ বিন আবি আদী, মুহাম্মদ বিন জাফর গুনদর। ইয়াহইয়া বিন সায়ীদ কাত্তান। আব্দুর রহমান বিন মাহদী, বিশর বিন মুফাযযল, মুহাম্মদ বিন আবি বকর বুরসানী, আবু দাউদ তায়ালসী, রাউহ্ বিন উবাদা, ওকীহ বিন জাররাহ, আবু মুআবিয়া যারীর, আব্দুল্লাহ বিন নুমাইর, আবু উসামা, সুফিয়ান বিন উয়াইনা, ইয়াহইয়া বিন সুলাইম তায়েফী, মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী, ইব্রাহীম বিন সাদ যুহরী, আব্দুর রাযযাক বিন হাম্মাম ছনআনী, আবু কোররা মুসা বিন তারেক, ওলীদ বিন মুসলিম, আবু মুসহির দামেস্কী, আবুল ইয়ামান আলী বিন আয়্যাশ, বিশর বিন শুআইব বিন আবি হামযা। এঁদের নাম উল্লেখ শেষে খতীব বাগদাদী লিখেন,

এদের ছাড়াও আরো অনেক উলামা থেকে হাদীছ শিক্ষা করেন। যাদের পরিসংখ্যান দুঃসাধ্য।

‘মানাকেবে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল’ কিতাবে এদের নাম তিরিশাধিক পৃষ্ঠাব্যাপী বর্ণনা করা হয়।

ইমাম শাফেয়ীর সাথে বিশেষ সম্পর্ক এবং তার শিষ্যত্ব:
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তাঁর শায়খদের মধ্যে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-এর অধিক নৈকট্য অর্জন করেছিলেন। এ সম্পর্কে ইবনে খিল্লিকান লিখেন

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ইমাম শাফেয়ীর প্রিয় ছাত্রদের অন্যতম। ইমাম শাফেয়ীর মিশর গমন পর্যন্ত তিনি তাঁর সাথেই ছিলেন। তার সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, আমি বাগদাদ থেকে প্রত্যাবর্তন কালে আহমদ বিন হাম্বল হতে অধিক মুত্তাকী এবং ফিকাহবিদ আর কাউকে রেখে আসিনি।

ইমাম সাহেব স্বয়ং বলেন, আমি ইমাম শাফেয়ীর মজলিসে বসার পরেই নাসেখ এবং মনসুখ হাদীছ সম্পর্কে অবগত হয়েছি।

ইমাম সাহেবের পুত্র আব্দুল্লাহ তার পিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই শাফেয়ী কে? প্রায়ই দেখছি আপনি তার জন্য দোয়া করেন। তিনি বললেন বেটা! শাফেয়ী হচ্ছেন দুনিয়ার জন্য সূর্যতুল্য বা দেহের জন্য সুস্থতাতুল্য। এ দুটোর কি কোন বিকল্প থাকতে পারে? আমি তিরিশ বৎসর যাবত প্রত্যহ শাফেয়ীর জন্য দোয়া করছি। যারা ইলম অর্জন করছে তাদের প্রত্যেকের উপরই ইমাম শাফেয়ীর ইহসান রয়েছে।

ইয়াহইয়া বিন ময়ীন বলেন, আহমদ বিন হাম্বল আমাদেরকে ইমাম শাফেয়ীর মজলিসে যেতে নিষেধ করতেন। একদিন দেখলাম যে, ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) খচ্চরের উপর সওয়ার হয়ে চলছেন আর ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তার পিছনে পিছনে হেঁটে চলছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আমাদেরকে ইমাম শাফেয়ীর মজলিসে যাওয়া থেকে বিরত রাখতেন আর এখন দেখছি আপনি নিজেই তার খচ্চরের পিছনে চলছেন? তিনি বললেন, চুপ থাক! তার খচ্চরের সাথে চললেও আমি উপকৃত হব। 

মাহফুজ বিন আবি তওবা বলেন, একদিন আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে ইমাম শাফেয়ীর মজলিসে বসা দেখে তাকে বললাম, আবু আব্দিল্লাহ! আপনি শাফেয়ীর মজলিসে বসে আছেন অথচ সুফিয়ান বিন উয়াইনা মসজিদের কোনে বসে হাদীছ পড়াচ্ছেন। তিনি বললেন

সুফিয়ান বিন উয়াইনাকে পরেও পাওয়া যাবে। কিন্তু শাফেয়ীকে পাওয়া যাবে না। 

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ১৯৫ হিজরীতে প্রথমবারের মত বাগদাদ আগমন করেন। সে সময় তিনি দু’বৎসর সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তিনি ১৯৮ হিজরীতে দ্বিতীয়বারের মত বাগদাদ আগমন করেন। এখানে কয়েকমাস অবস্থান করে মিশর গমন করেন। ঐ সময় ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) থেকে পুরোপুরিভাবে উপকৃত হন। এ সময়ে ইমাম শাফেয়ীর নিকট কাযী হবার প্রস্তাব আসে কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এর পূর্বেও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল হজ্ব উপলক্ষে মক্কায় গিয়ে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) থেকে শিক্ষা লাভ করেন। 

আল্লামা সুবকী ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে ইমাম শাফেয়ীর ছাত্রদের মধ্যে গণ্য করেছেন।

উস্তাদ, শায়খ এবং বড়দের সম্মান

ইয়াহইয়া বিন ময়ীন বাগদাদে একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে ইমাম শাফেয়ীর সওয়ারীর সাথে চলতে দেখে তার পুত্র আব্দুল্লাহকে বললেন, শাফেয়ীর সওয়ারীর সাথে চলতে আপনার পিতার কি লজ্জা আসে না? তিনি তার পিতার নিকট এর উল্লেখ করলে তিনি বললেন, তুমি ইয়াহইয়া বিন ময়ীনকে বলে দিও যে, তুমি তার বাম পাশ দিয়ে চললেও জ্ঞান (ইলম) অর্জিত হবে।

খলফ হতে ইদ্রীস বিন আব্দিল করীম বর্ণনা করেন, একবার আহমদ বিন হাম্বল আৰু আওয়ানার হাদীছ শুনার জন্য আমার নিকট আগমন করেন। আমি তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করতে চাইলে তিনি বললেন,

আমি আপনার সম্মুখেই বসব। কারণ যার নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করব তার সাথে বিনয় করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ইসহাক শহীদ বর্ণনা করেন, আছরের নামাযের পর ইয়াহইয়া বিন সায়ীদ কাত্তান মসজিদের মিনারায় হেলান দিয়ে বসে যেতেন আর তার সামনে আলী বিন মাদীনী, আমর বিন আলী, আহমদ বিন হাম্বল, ইয়াহইয়া বিন ময়ীন প্রমুখ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাদীছ শ্রবণ করতেন। তিনি কাউকে বসতেও বলতেন না। আর তাঁর সামনে বসার কারো সাহসও হত না।

কুতাইবা বিন সায়ীদ বলেন, আমি আহমদ বিন হাম্বলের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বাগদাদ গেলাম। তিনি ইয়াহইয়া বিন ময়ীনসহ আমার নিকট আসলেন। আমরা হাদীছের আলোচনা করতে লাগলাম। যতক্ষণ আলোচনা করছিলাম আহমদ বিন হাম্বল আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁকে বসতে বললে, বলতেন

আপনি আমাকে নিয়ে ভাববেন না। আমি সঠিক পদ্ধতিতে ইলম অর্জন করতে চাই।

আমর নাকেদ বলেন, আমরা ওকী বিন জাররাহর মজলিসে বসা ছিলাম। এমন সময় আহমদ বিন হাম্বল এসে নীরবে বসে গেলেন। আমি তাকে বললাম, শায়খ আপনাকে সম্মান করেন। আপনি কথা বলছেন না কেন? তিনি বললেন-

যদিও তিনি আমাকে সম্মান করেন তবুও তাঁর মর্যাদা রক্ষা করা আমার উচিত।

হাদীছ বর্ণনা এবং ফতোয়া

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল চল্লিশ বৎসর শিক্ষা অর্জনে ব্যয় করেন। এ সময়ে তিনি শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেই হাদীছ রেওয়ায়েত করতেন কিংবা ফতোয়া দিতেন। চল্লিশ বৎসর বয়সেই তিনি নিয়মিত শিক্ষা মজলিস কায়েম করেন।

নাউহ্ বিন হাবীব বলেন, ১৯৮ হিজরীতে দেখতে পেলাম যে, ইমাম, আহমদ বিন হাম্বল মসজিদে খায়ফের মিনারায় হেলান দিয়ে ছাত্রদেরকে ফিকাহ, হাদীছ এবং হজ্ব সম্পর্কিত মাসয়ালা শিক্ষা দিচ্ছেন। তাঁর সাথে পরিচয় না থাকায় চিনতে পারিনি। এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম ইনি কে? সে বলল, ইনি হচ্ছেন আহমদ বিন হাম্বল। তার নাম শুনে সেখানে রয়ে গেলাম। ছাত্রদের ভীড় শেষ হলে আমি সালাম করে তাঁর হাত চেপে ধরলাম। তখন থেকেই আমরা পরস্পরে পরিচিত হয়ে যাই।

হাজ্জাজ বিন শায়ের বর্ণনা করেন, আমি ২০৩ হিজরীতে আহমদ বিন হাম্বলের খিদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁকে হাদীছ বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করলাম। কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর আমি ইয়ামানে আব্দুর রাযযাক ছনআনীর নিকট গিয়ে হাদীছ শ্রবণ করি। ২০৪ হিজরীতে সেখান থেকে ফিরে দেখি আহমদ বিন হাম্বল নিয়মিত দরসী মজলিস শুরু করে দিয়েছেন। তাঁর দরসী মজলিসে অনেক ছাত্রের সমাগম হতো। ঐ সময় তাঁর বয়স চল্লিশে উপনীত হয়ে গিয়েছিল। 

এ ঘটনা থেকে বুঝা যায়, ইমাম সাহেব নিয়মিত দরস শুরু করার আগেই সমসাময়িকদের মধ্যে তিনি শায়খদের মর্যাদায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। আহলে ইলমগণ তার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে চাইতেন, কিন্তু তিনি এতে সম্মত হতেন না।

শায়খদের জীবদ্দশায় তাঁদের বর্ণিত হাদীছ বর্ণনা না করা

মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান ছায়রাফী বলেন, একবার আমি আহমদ বিন হাম্বলের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি আব্দুর রাযযাক থেকে একটি হাদীছ বর্ণনা করলেন। আমি বললাম, আপনি হাদীছটি বলুন আমি লিখে নিচ্ছি। তিনি বললেন, এখনও আব্দুর রাযযাক জীবিত আছেন। তুমি আমার নিকট থেকে হাদীছ বর্ণনা করবে কেন? আমি বললাম, আল্লাহর কসম সত্য বলছি আপনি যদি আমার নিকট হাদীছটি বর্ণনা করেন- আর আমি আপনার দরজা অতিক্রম করেই আব্দুর রাযযাকের সাক্ষাৎ পাই তবু তাকে এ হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব না। ইমাম সাহেব দরসী মজলিস কায়েম করা সত্ত্বেও শায়খদের জীবদ্দশায় তাদের বর্ণিত হাদীছ রেওয়ায়েত করতে পছন্দ করতেন না। হাদীছ শিক্ষার্থীদেরকে সরাসরি তাদের নিকট থেকে হাদীছ শ্রবণ করার পরমর্শ দিতেন। বলতেন, তোমরা তাঁদের নিকট গিয়ে তাঁদের হাদীছ রেওয়ায়েত কর।

হামদান বিন আলী ওররাক বলেন, ২১৩ হিজরীতে আমরা আহমদ বিন হাম্বলের নিকট গিয়ে হাদীছ বর্ণনা করার অনুরোধ জানালাম। তিনি বললেন, আবু আছেমের মত বিজ্ঞ আলেম জীবিত থাকতে তোমরা আমার নিকট হাদীছ গুনবে? যাও তার নিকট গিয়ে হাদীছ শুন।

যুবাকালে প্রসিদ্ধি

যৌবনকালেই ইমাম সাহেবের ইলমের প্রসিদ্ধি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর বন্ধু-বান্ধব, সমসাময়িকগণ এবং উলামা ও মাশায়েখগণ তাঁর ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। তাঁর জ্ঞান, মর্যাদা, যুহদ এবং তাকওয়া সবার নিকট স্বীকৃত ছিল। কুতাইবা বিন সায়ীদ বলেন,

আমাদের যমানার সবচেয়ে বড় আলেম হচ্ছেন ইবনুল মুবারক। এরপর এই যুবকটি অর্থাৎ আহমদ বিন হাম্বল।

একবার আবু মুসহিরকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনার দৃষ্টিতে কি এমন কোন ব্যক্তি আছেন যিনি ধর্মীয় বিষয়গুলো হিফাযত করতে সক্ষম? তিনি উত্তরে বললেন,

পূর্ব বাগদাদের এক যুবক অর্থাৎ আহমদ বিন হাম্বল ব্যতীত আর কাউকে একাজে সক্ষম দেখছি না।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) শেষবারের মত যখন ১৯৮ হিজরীতে বাগদাদ আগমন করেন, তখন ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের (রহঃ) বয়স ছিল চৌত্রিশ বৎসর। ইমাম শাফেয়ী সেখানে কয়েকমাস অবস্থান করে যখন মিশর গমন করেন, তখন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল সম্পর্কে বলেছিলেন, বাগদাদে আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বল অপেক্ষা বড় ফকীহ, যাহেদ কিংবা আলেম কাউকে রেখে আসিনি।

ওকী বিন জাররাহ এবং হাফছ বিন গিয়াস বলতেন,

এ যুবক অর্থাৎ আহমদ বিন হাম্বলের মত কোন আলেম কুফায় আসেনি।

এ সৎ ও নেককার যুবক সবার দৃষ্টিতে একজন বরণীয় আলেম হওয়া, সত্ত্বেও নবুওয়্যতের বয়স অর্থাৎ চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে দরসী মজলিস কায়েম করেননি। আর যখন কায়েম করলেন তখন ইলমের জগৎ সঙ্কুচিত হয়ে, তাঁর মজলিসে জড়ো হতে লাগল।

মজলিসে দরস

ইবনে জওযী প্রমুখ উল্লেখ করেন যে, চল্লিশ বৎসর বয়সের পরেই ইমাম আহমদ বিন হাম্বল হাদীছ বর্ণনা এবং ফতোয়া দানের আসনে আসীন হন। তিনি অত্যন্ত সতর্কতা, ইখলাছ সহকারে এ দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। মজলিসে অংশগ্রহণকারীদেরকে ভালবাসার মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। তার প্রতিটি কাজে, তাদের মঙ্গল কামনার আভা ফুটে উঠত।

আবুল কাসেম বিন মনী বর্ণনা করেন, আমি সুওয়াইদ বিন সায়ীদের দরসী মজলিসে অংশগ্রহণের সুযোগ দানের জন্য সুপারিশ করে চিঠি লিখে দেয়ার জন্য ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে অনুরোধ করলাম। তিনি আমার সম্পর্কে এরূপ লিখলেন;

এ ব্যক্তি হাদীছ লিখে। আমি বললাম, আমি আপনার নিকট এতদিন যাবৎ রয়েছি। আপনি যদি এ কথাটি লিখে দেন (এ ব্যক্তি মুহাদ্দিছ) তবে ভাল হত। তিনি বললেন,

‘আমাদের নিকট মুহাদ্দিছ সেই, যে হাদীছ অনুযায়ী আমল করে।’

তিনি তার শাগরেদ গনকে সনদে আলী (হাদীছ বর্ণনাকারী এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে সম্ভাব্য কম মাধ্যম হওয়া) গ্রহণ করার পরামর্শ দিতেন এবং বলতেন এটা সলফদের সুন্নত বা রীতি। একবার তাকে সনদে আলী সন্ধানকারী শিক্ষার্থী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি বললেন, সনদে আলী তালাশ করা সলফদের সুন্নাত বা রীতি। হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ)-এর শাগরেদগণ কুফায় তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শ্রবণ করতেন।

হাম্বল বিন ইসহাক বলেন, একবার ইমাম সাহেব আমাকে সূক্ষ্ম লেখা লিখতে দেখে বললেন, এত সূক্ষ্ম লেখা লিখ না। কারণ প্রয়োজনের সময় এটা কোন কাজে আসবে না।

শিক্ষা অন্বেষণের ক্ষেত্রে ‘রিয়া থেকে বাঁচার জন্য খুব বেশী তাকিদ দিতেন। বলতেন- দোয়াত দেখানও রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। কারণ এতে মানুষে বুঝে যে, এ লোক হাদীছ লিখে।

মজলিসে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা

ইমাম সাহেবের শিক্ষা মজলিসে আহলে ইলম এবং সাধারণ উভয় শ্রেণীর লোকের বেশ সমাগম হত। আহলে ইলমগণ হাদীছের শিক্ষা নিতেন এবং সাধারণ শ্রেণীর লোক তার কাছে আদব শিখতেন।

হাসান বিন ইসমাঈল তার পিতার থেকে বর্ণনা করেন,

আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর মজলিসে পাঁচ সহস্রাধিক লোকের সমাগম হত। তন্মধ্যে পাঁচশতেরও কম সংখ্যক লোক হাদীছ লিখতেন। অন্যান্যরা তার কাছে আদব শিখতেন।

আবু বকর বিন মুততাবেয়ী বলেন, আমি বার বৎসর পর্যন্ত আহমদ বিন হাম্বলের দরসী মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। তিনি তার সন্তানদেরকে মুসনাদ শিক্ষা দিচ্ছিলেন। ঐ সময় আমি তার নিকট থেকে কোন হাদীছ লিখিনি। বরং তার চরিত্র এবং আদব-আখলাক প্রত্যক্ষ করেছি।

মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম আনমাতী বর্ণনা করেন, আমি ইমাম সাহেবের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। আমার সামনে দোয়াত ছিল না। তার সামনে দোয়াত রাখা ছিল। ইমাম সাহেব একটি হাদীছ বর্ণনা করলেন, আমি তার দোয়াত থেকে লিখার অনুমতি চাইলে তিনি এ বলে অনুমতি দিলেন।

লিখ! এটা (অনুমতি চাওয়া) অন্ধ তাকওয়া।

ছাত্রদের মর্যাদা এবং সুখ-শান্তির প্রতি লক্ষ্য

মুহাম্মদ বিন দাউদ মিসসিসী বলেন, আমরা হাদীছ শিক্ষার্থীরা একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মজলিসে বসে হাদীছের আলোচনা করছিলাম। মুহাম্মদ বিন ইয়াহয়া একটি দুর্বল হাদীছ রেওয়ায়েত করলে ইমাম সাহেব বললেন, এ ধরনের হাদীছ বর্ণনা করো না। এ কথা শুনে মুহাম্মদ বিন ইয়াহইয়া লজ্জিত হল। ইমাম সাহেব তাকে খুশী করার জন্য বললেন, আবু আব্দিল্লাহ! এ কথাটি আমি তোমার মর্যাদা বজায় রাখার জন্য বলেছি।

ইমাম সাহেব তার ছাত্রদের সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। অন্যদেরকেও এ বিষয়ে তাকিদ করতেন।

হারুন বিন আব্দিল্লাহ হাম্মাল বলেন, একরাত্রে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল। আমার বাড়ীতে এসে উপস্থিত হলেন। সালামের পর তাঁকে অসময়ে আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, আপনি আজ আবার আমার মনে অশান্তি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আমি বললাম, আবু আব্দিল্লাহ! কি ব্যাপার? তিনি বললেন, আমি আপনার মজলিসের নিকট দিয়ে যাবার সময় দেখতে পেলাম যে, আপনি ছায়ায় বসে হাদীছ পড়াচ্ছেন আর ছাত্ররা কাগজ কলম নিয়ে রৌদ্রে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর বললেন,

এরূপ আর করবেন না। পড়াতে বসলে শিক্ষার্থীদের সাথে বসবেন।

ছাত্রদের সাথে হাসি-কৌতুক

ইমাম সাহেব তার মজলিসে অংশ গ্রহণকারীদের সাথে হাসি-কৌতুক করতেন। ইসহাক বিন হানী বর্ণনা করেন, আমরা ইমাম সাহেবের মজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম। সেখানে আবু বকর মারওয়াযী এবং মুহান্না বিন ইয়াহইয়া শামীও উপস্থিত ছিলেন। এক ব্যক্তি এসে বাহির হতে দরজায় করাঘাত করে জিজ্ঞেস করল, মারওয়াযী এখানে আছে কি? মারওয়াযী ঐ ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করতে অনিচ্ছুক। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মুহান্না বিন ইয়াহইয়া তার হাতের তালুতে আঙ্গুল রেখে ভিতর হতে জবাব দিলেন, মারওয়াযী এখানে (হাতের তালুতে) নেই। তাঁর এখানে কি কাজ? এ তামাশা দেখে ইমাম সাহেব হেসে উঠলেন।

ইমাম সাহেবের এক প্রতিবেশী বড়ই পাপী এবং লম্পট ছিল। একদিন সে মজলিসে এসে ইমাম সাহেবকে সালাম করল। ইমাম সাহেব সঙ্কোচ মনে উত্তর দিলেন। সে বলল, আপনি আমাকে দেখে বিরক্তি বোধ করবেন না। কারণ আমি একটি স্বপ্ন দেখে সম্পূর্ণরূপে বদলে গিয়েছি। ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন

তুমি স্বপ্নে কি দেখেছ? সে বলল, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পেলাম যে, তিনি একটি উঁচু জায়গায় বসে আছেন। নীচে অনেক লোক সমবেত হয়ে আছে। তাদের মধ্য হতে একজন একজন করে উঠে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট বলছে আপনি আমার জন্য দোয়া করুন। তিনি তাদের জন্য দোয়া করলেন। সর্বশেষে যখন আমি উঠতে চাইলাম তখন পাপের কারণে লজ্জিত হয়ে আমি উঠতে পারিনি। তিনি আমার নাম ধরে বললেন, হে অমুক! তুমি উঠে এসে আমার নিকট দোয়া চাচ্ছেনা কেন? আমি আরয করলাম-আমার পাপিষ্ঠ জীবনের প্রতি লক্ষ্য করে লজ্জায় আসতে পারি না। তিনি বললেন, তুমি আমার নিকট দোয়ার প্রার্থনা কর। আমি তোমার জন্য দোয়া করব। কারণ তুমি আমার কোন ছাহাবীকে মন্দ বল না। অবশেষে আমিও উঠে গিয়ে তার নিকট দোয়া প্রার্থনা করলাম। তিনি আমার জন্য দোয়া করলেন। পরে স্বপ্ন থেকে জাগ্রত হয়ে আমার অতীত জীবন থেকে তওবা করে নিয়েছি।

এ স্বপ্নের বিবরণ শুনে ইমাম সাহেব উপস্থিত ব্যক্তিদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, হে জাফর! হে অমুক! হে অমুক! তোমরা এ ঘটনা স্মরণ রেখো এবং মানুষকে শুনিও। এ ঘটনা অবশ্যই উপদেশমূলক।

মানুষের অন্তরে তার ভয়ভীতি

মুহাম্মদ বিন মুসলেম বলেন, আমরা ইমাম সাহেবের গাম্ভীর্য ও তাঁর দ্বীনি এবং ইলমী প্রভাবের দরুন তাঁর কোন কথার উত্তর দিতে কিংবা কোন বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করতে ভয় পেতাম।

আরদৌস নামক জনৈক ব্যক্তি বলেন, ইমাম সাহেব একবার আমাকে হাসতে দেখেছেন। এর দরুন এখনও আমি লজ্জিত হয়ে আছি।

আবু উবাইদ কাসেম বিন সাল্লাম বলেন, আমি কাযী আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ বিন হাসান শায়বানী, ইয়াহইয়া বিন সায়ীদ কাত্তান, আব্দুর রহমান বিন মাহদী প্রমুখের মজলিসে বসেছি। কিন্তু আহমদ বিন হাম্বলের ন্যায় অন্য কারও ভয় আমার অন্তরে প্রভাব বিস্তার করেনি।

আবু দাউদ বলেন- ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর মজলিস ছিল আখেরাতের মজলিস। তাঁর মজলিসে পার্থিব কোন আলোচনাই হত না। আমি তাঁকে কখনও দুনিয়ার নাম নিতে শুনিনি। দৃশ্যতঃ মাশায়েখের সাথে আমি সাক্ষাৎ করেছি কিন্তু তার মত কাউকে পাইনি। সাধারণ লোক যে সব পার্থিব

বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তিনি সে ধরনের আলোচনায় লিপ্ত হতেন না। অবশ্য ইলমী বিষয়ে তিনি মন খুলে আলোচনা করতেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, আমি বাগদাদে এক যুবক দেখেছি। সে যখন বলে, অমুক আমার নিকট হাদীছ বর্ণনা করেছেন সবাই তা এক বাক্যে বিশ্বাস করে। এ যুবক হচ্ছে আহমদ বিন হাম্বল।

তার মত এবং মন্তব্য লিখায় নিষেধাজ্ঞা

ইমাম সাহেব হাদীছ ব্যতীত তার অন্য কোন মত কিংবা রায় লিখতে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন।

হাম্বল বিন ইসহাক বলেন, ইমাম সাহেব তার ফতোয়া কিংবা রায় লিখা পছন্দ করতেন না। একবার তিনি জানতে পারলেন যে, ইসহাক নামক একব্যক্তি খোরাসানে তার ফতোয়া এবং মাসয়ালা বর্ণনা করছে। তিনি বললেন, তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমি ঐ সমস্ত মাসয়ালা হতে প্রত্যাবর্তন করেছি।

আবু বকর মারওয়ানী বলেন, খোরাসানের এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবকে এক খণ্ড কিতাব দিল। তাতে ইমাম সাহেবের রায় এবং মত লিখিত ছিল। তা দেখে তিনি অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে কিতাবটি রেখে দিলেন। ইবনে জাওযী বলেন, ইমাম সাহেব বিনয়ার্থে তার রায় লিখতে নিষেধ করেছেন। আর আল্লাহর রহমতে সেগুলো সব সংকলিত এবং প্রকাশিত হয়েই গেছে।

কিতাব থেকে রেওয়ায়াত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর লক্ষ লক্ষ হাদীছ মুখস্ত ছিল। এতে কোন অতিরজন নেই। এতদসত্বেও তিনি মুখস্ত কোন হাদীছ রেওয়ায়াত করতেন না। বরং সতর্কতামূলক শুধুমাত্র কিতাব দেখেই হাদীছ পড়াতেন।

তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ বলেন, আমার পিতা কিতাব ব্যতীত মুখস্ত যে হাদীছ বর্ণনা করেছেন সেগুলোর সংখ্যা একশতও হবে না।

আলী বিন মাদীনী বলেন, আমাদের উস্তাদদের মধ্যে আহমদ বিন হাম্বল হতে অধিক হাদীছ কারও মুখস্ত নেই। আমি জানতে পেরেছি যে, তিনি শুধুমাত্র কিতাব দেখেই হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। এটা আমাদের জন্য একটা আদর্শ।

ইব্রাহীম বিন জাবের মারওয়াযী বলেন, আমরা ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মজলিসে বসে হাদীছের আলোচনা করতাম। সেগুলো যখন লিখতে চাইতাম তিনি বলতেন, কিতাব অধিক নিরাপদ। অতঃপর উঠে গিয়ে কিতাব আনতেন।

ইমাম সাহেব হাদীছ মুখস্ত করার চেয়ে লিখে নেয়াকে প্রাধান্য দিতেন। কারণ এতে ভুল হবার সম্ভাবনা কম থাকে। তিনি সূক্ষ বা ছোট লেখা লিখতে নিষেধ করতেন। কারণ এতে ভুল হওয়ার আশংকা থাকে।

আহমদ বিন হাম্বল এবং ইয়াহইয়া বিন ময়ীনের উক্তি রয়েছে, যে ব্যক্তি হাদীছ লিখে না তার ভুল না হবার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

ইসহাক বিন মনসুর বলেন, আমি ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, উলামাদের মধ্যে কারা হাদীছ লিখাটাকে অপছন্দ করেছেন? তিনি বললেন, উলামাদের মধ্যে একদল হাদীছ লিখাটাকে অপছন্দ করেছেন। অন্যদল লিখার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বললাম, ইলম অর্থাৎ হাদীছ যদি লিখে রাখা না হত তাহলে তা শেষ হয়ে যেত। তিনি বললেন, হ্যা যদি লিখে রাখা না হত তবে আমরা কিছুই পেতাম না।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল তার উস্তাদ আব্দুর রাযযাক হতে ইমাম যুহরীর এ কথাটি বর্ণনা করেছেন

আমরা হাদীছ লিখাটা অপছন্দ করতাম। পরে সে সব উমারাগণ (উমর বিন আব্দিল আযীয় এবং তার কর্মচারী) একাজে বাধ্য করে। এখন আর আমরা মুসলমানদেরকে একাজ থেকে নিষেধ করা সমীচীন মনে করি না।

ইমাম সাহেব হাদীছ লিখে নিতেন পরে সেগুলো মুখস্ত করে নিতেন। এতে একই সাথে তা ‘সীনা’ বা অন্তর এবং কিতাব দু’জায়গায়ই সংরক্ষিত হয়ে যেত। আবু যরআ রাযী বলেন, ইমাম সাহেবের এক লক্ষ হাদীছ মুখস্ত ছিল। তিনি আরো বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর কিতাবগুলো একত্রিত করা হলে দেখা গেল যে, সেখানে বার গাঁইট পরিমাণ কিতাব রয়েছে। সেগুলো কোনটির মধ্যেই লিখা ছিল না যে, এগুলো অমুক মুহাদ্দিছের হাদীছ কিংবা অমুক শায়খ এ হাদীছগুলো বর্ণনা করেছেন। এ সবগুলো ইমাম সাহেবের হিফয বা মুখস্ত ছিল।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) হাদীছ লিখা এবং হিফয করা উভয় পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন। ছাত্রদেরকেও উভয় প্রকার পদ্ধতি অবলম্বন করার পরামর্শ এবং নির্দেশ দিতেন।

তার ছাত্র এবং শিষ্য

ইমাম সাহেবের ছাত্রের সংখ্যা কয়েক সহস্র। এদের মধ্যে তার অনেক শায়খও রয়েছেন। যেমন আব্দুর রাযযাক সনআনী, ইসমাঈল বিন উলাইয়্যা, ওকী বিন জাররাহ, আব্দুর রহমান বিন মাহদী, মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী, মারূফ কারখী, আলী বিন মাদীনী প্রমুখ।

ইবনে জাওযী তার রচিত ‘মানাকেবে ইমাম আহমদ’ নামক কিতাবে আরবী বর্ণমালার ক্রমানুসারে কয়েক পৃষ্ঠা ব্যাপী তার শাগরেদদের নাম উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে পাঁচজন মহিলাও রয়েছেন। প্রসিদ্ধ কয়েকজন শাগরেদের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে

ইমাম সাহেবের দুই পুত্র ছালেহ এবং আব্দুল্লাহ, তার চাচাত ভাই হাম্বল বিন ইসহাক, হাসান বিন সাব্বাহ বাযযায, মুহাম্মদ বিন ইসহাক সাগানী, আব্বাস বিন মুহাম্মদ দুরী, মুহাম্মদ বিন উবাইদুল্লাহ মুনাদী, মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী, মুসলিম বিন হাজ্জাজ নিসাপুরী, আবু যরআ রাযী, আবু হাত্বেম রাযী, আবু দাউদ সিজিস্তানী, আবু বকর আছরাম, আবু বকর মারওয়াযী, ইয়াকুব বিন শাইবা, আহমদ বিন আবি খাইছামা, আবু যুরআ দামেস্কী, ইব্রাহীম হরবী, মুসা বিন হারুন, আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বগবী, ইয়াহইয়া বিন আদম কুরাশী, ইয়াযীদ বিন হারুন, কুতাইবা বিন সায়ীদ, দাউদ বিন আমর, খলফ বিন হিশাম, আহমদ বিন আবি হাওয়ারী, হুসাইন বিন মনছুর, যিয়াদ বিন আইউব, আবু কুদামা সরখসী, মুহাম্মদ বিন রাফে, মুহাম্মদ বিন ইয়াহইয়া বিন আবি সুমাইনা, হরব কিরমানী, বকী বিন মুখাল্লাদ, শাবীন বিন সুমাইদা, হুবাইশ বিন সিন্দী, আবু বকর সিন্দী খাওয়াতেমী প্রমুখ। এদের মধ্যে আবুল কাসেম বগবী হচ্ছেন ইমাম সাহেবের সর্বশেষ ছাত্র।

আহমদ বিন মুনাদী বলেন, ধরাপৃষ্ঠে আব্দুল্লাহ তার পিতা আহমদ বিন হাম্বল হতে সর্বাধিক হাদীছ রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি তার পিতা থেকে তিরিশ হাজার হাদীছ সম্বলিত মুসনাদ এবং বিশ হাজার হাদীছ সম্বলিত তফসীর শ্রবণ করেছেন।

সিন্দু-র এক উস্তাদ এবং দু’শাগরেদ

ইমাম সাহেবের উস্তাদদের মধ্যে ইসমাঈল বিন উলাইয়্যা এবং শাগরেদদের মধ্যে হুবাঈল বিন সিন্দী এবং আবু বকর সিদ্দী খাওয়াতীমীর নাম পাওয়া যায়। এদের প্রত্যেকেই সিন্দ এলাকার সাথে সম্পর্কিত। ইমাম সাহেব একজন থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছেন। আর দুজন তার নিকট থেকে শ্রবণ করেছেন। তাদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হচ্ছে।

ইবনে উলাইয়্যা বাগদাদী
ইমাম সাহেব বিশিষ্ট উস্তাদ ইমাম বাশার ইসমাঈল বিন ইব্রাহীম বিন মেকসাম আল আসাদী আল বসরী আল বাগদাদী (রহঃ)-এর দাদা মেকসাম সিন্দের অর্ন্তগত গেগান নামক এলাকার অধিবাসী ছিলেন। কোন এক যুদ্ধে বন্দী হয়ে কুফায় নীত হন। সেখানে আব্দুর রহমান বিন কুতবা আসাদীর আশ্রয়ে জীবন যাপন করতে থাকেন। 

তার ছেলে ইব্রাহীম কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ব্যবসা উপলক্ষে বসরায় আসা-যাওয়া করতেন। সেখানে তিনি উলাইয়্যা বিনতে হাসানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তারই গর্ভে ইসমাঈল বিন ইব্রাহীমের জন্ম হয়। তিনি তৎকালীন যুগে হাদীছের ইমাম ছিলেন। ইমাম সাহেব ব্যতীতও তার নিকট থেকে ইবনে জুরাইজ, শোবা হাম্মাদ বিন যায়েদ, আব্দুর রহমান বিন মাহদী, ইয়াহইয়া বিন ময়ীন, আলী বিন মদীনী প্রমুখ হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তিরিশ বৎসর বয়সে ইমাম সাহেব ইবনে উলাইয়্যার দরসগাহে শরীক হন। ইবনে উলাইয়্যা এবং তার পরিবারের সবাই তাঁকে সম্মান করত। তাঁর উপস্থিতিতে দরসী মজলিসের গাম্ভীর্যতা বজায় থাকত।

হুবাইশ বিন সিন্দী বাগদাদী

ইনি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের বিশিষ্ট ছাত্রদের অন্যতম। খতীব বাগদাদী ‘তারিখে বাগদাদ’ কিতাবে এবং ইবনে জাওযী মানাকেবে ইমাম আহমদ কিতাবে তার আলোচনা করেছেন। তিনি ইমাম সাহেব থেকে প্রায় বিশ হাজার হাদীছ লিখেছেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আলেম ছিলেন। তার নিকট ইমাম সাহেবের বর্ণিত বিশেষ বিশেষ মাসয়ালার দুটি খণ্ড ছিল যা অন্যদের নিকট ছিল না। আবু খাল্লাল উল্লেখ করেন, তিনি তার নিকট সে মাসয়ালাগুলো শুনতে গেলে তিনি সেগুলো বর্ণনা করতে অস্বীকৃতি জানান। বলেন, আবু বকর মারওয়াযী জীবিত রয়েছেন, সেগুলো আমি বর্ণনা করতে পারি না। তিনি তার উস্তাদ তাই আবু বকর মারওয়াযীকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। তার সাথে অনেক আলোচনা করেও যখন ব্যর্থ হলেন তখন সেখান থেকে আবু বকর মারওয়াযী হতে সুপারিশনামা সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে বের হলেন। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তার নিকট যেতে পারেননি। আর সুপারিশনামাও সংগ্রহ করতে সক্ষম হননি। এর মধ্যেই তার ইন্তেকাল হয়। পরে তিনি সেগুলো মুহাম্মদ বিন হারুন ওরাকের নিকট পেয়ে সেখান থেকে শ্রবণ করেন। আর খালাল আরও উল্লেখ করেন যে, হুবাইশ বিন সিন্দী একজন মর্যাদাশীল বিজ্ঞ আলেম ছিলেন। তিনি বাগদাদের কাতীয়া নামক স্থানে অবস্থান করতেন, সেখানে তার মত বিজ্ঞ আরেকজন ছিলেন না।

হুবাইশ বিন সিন্দী থেকে ইমাম সাহেবের কয়েকটি মতও বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, যে ব্যক্তি খলকে কোরআনের ফিতনার সময় অটল থাকেনি, আমরা কি তার নিকট থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করব? জানতে পারলাম যে আপনি কাওয়ারেরী থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করার অনুমতি দিচ্ছেন। তিনি বললেন, আমি নিজে তার নিকট থেকে রেওয়ায়েত করিনা। অন্যকে কিভাবে নির্দেশ দিব?

হুবাইশ বিন সিন্দী থেকে আরও বর্ণিত রয়েছে যে, ইমাম সাহেবকে হামযার কিরাআত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, এ কিরাআতটা আমার মোটেই পছন্দ হয় না। কারণ হিসেবে বললেন এ কিরাআতে শুধু ইহ-আহ্’ই সার। আর এ কিরাআতটি সম্পূর্ণ নতুন। অন্য কেউই এ কিরাআত পড়েনি। 

ইমাম সাহেবের সাথে উলামায়ে সিন্দের দ্বীনি এবং ইলমী বিষয়ে আরও একটি সম্বন্ধ সংযোজিত হয়েছে। তা হচ্ছে ইমাম আবু হাসান বিন আব্দিল হাদী তাতুবী সিন্দী, মাদানী (মৃত্যু ১১৩৬ হিজরী) (রহঃ) মুসনাদে ইমাম আহমদ’-এর একটি উত্তম টীকা লিখেছেন। সনদ সহকারে সেটি ছেপে প্রকাশিত হয়েছে।

আবু বকর সিদ্দী খাওয়াতীমী বাগদাদী

জীবনী লিখকগণ তার নাম সিন্দী আবু বকর বাগদাদী উল্লেখ করেছেন। ইবনে জাওযী তাকে ইমাম সাহেবের ছাত্রদের মধ্যে গণ্য করেছেন। ইবনে আবি ইয়ালা আবু খাল্লাল হতে বর্ণনা করেন, তিনি আবুল হারেছের প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের সন্তানদের সাথে একত্রে বসবাস করতেন। তাদের ঘরোয়া বিষয়ে তার অধিকার ছিল।

সিন্দী আবু বকর বাগদাদী যেন ইমাম সাহেবের পরিবারের একজন সদস্য ছিলেন। আর সে হিসাবেই সেখানে তার প্রভাব খাটত। তিনি ইমাম সাহেবের অবস্থা, মত এবং মন্তব্য বর্ণনা করেছেন। তার নিকট তিনি অনেক প্রয়োজনীয় মাসয়ালা শ্রবণ করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা হচ্ছে,

ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করা হল যে, নাভির নীচের লোম, নখ কয়দিনের মধ্যে পরিস্কার করা চাই? তিনি বললেন, এ বিষয়ে যে হাদীছ রয়েছে তার আলোকে দেখা যায় যে, এর জন্য সর্বাধিক সময় হচ্ছে চল্লিশ দিন। আমি জানতে পেরেছি যে, আওযায়ী (রহঃ) মেয়েদের জন্য পনের দিন এবং পুরুষদের জন্য বিশদিন রেখেছেন। প্রতি সপ্তাহে গোঁফ কাটা চাই। অন্যথায় বিশ্রী দেখা যাবে।

এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করল- আমার পিতা আমাকে আপন স্ত্রীকে তালাক দিতে বলছেন। আমি কি করব? তিনি বললেন, তুমি তালাক দিওনা। এতে সে বলল, হযরত উমর (রাঃ) কি তার ছেলে আব্দুল্লাহকে বলেননি- তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দাও? একথা শুনে ইমাম সাহেব বললেন, তোমার পিতা যখন উমরের মত হবেন তখন তুমিও তার কথা অনুযায়ী কাজ করো।

সিন্দী আবু বকর বাগদাদী বলেন, এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবকে বসতে জায়গা দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। কিন্তু ইমাম সাহেব সেখানে বসতে অস্বীকৃতি জানালেন। বললেন, তুমি তোমার স্থানে বস। সে নিজের জায়গায় বসার পরে ইমাম সাহেব তার সামনে বসলেন। 

ইমাম সাহেব ‘কাইয়েম আহকামুযযিম্মা’ নামক কিতাবে সিন্দী আবু বকর হতে রেওয়ায়েত করেন, ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করা হল যে, উশর বা শুল্ক আদায়কারীর নিকট দিয়ে যদি কোন যিম্মী অতিক্রম করে তবে তার মাল কি পরিমাণ হলে উশর রাখা হবে? তিনি বললেন, তার ব্যবসার মালের পরিমাণ যদি মুসলমানদের উশর ওয়াজেব হওযার দ্বিগুণ হয় তবে তার নিকট উশর রাখা হবে। কিন্তু পরবর্তী বৎসর তার নিকট থেকে উশর নেয়া হবে না। হাদীছে এরূপই বর্ণিত রয়েছে।

উস্তাদ মাশায়েখ এবং সমসাময়িকদের দৃষ্টিতে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল
বাল্যকাল থেকেই ইমাম সাহেব যুহদ, তাকওয়া, ইলম এবং আদব-আখলাক প্রভৃতি বিষয়ে সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা ঘরেই তাঁর প্রতিটি আচরণে মহত্বের নিদর্শন পাওয়া যেত। হাদীছ শিক্ষা গ্রহণের সময় অভাব-অনটনের মধ্যে যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন এতে তাঁর আসাতে এবং মাশায়েখদের কেবল সুদৃষ্টিই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়নি বরং তিনি তাদের নিকট সম্মানের পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। আর যখন তিনি শিক্ষকতা, করলেন তখন তার জ্ঞানগরিমা, হাদীছ এবং ফিকাহ শাস্ত্রে সূক্ষ্মদৃষ্টি, হাদীছ বর্ণনায় সতর্কতা প্রভৃতির কারণে তার সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আর খলকে কোরআনের ফিতনায় তিনি যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন, এতে তিনি সারা জগতে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। তৎকালীন বিশ্ব তাকে সেরা মানব হিসেবে গ্রহণ করে নিল। আর তার সাথে বেয়াদবীমূলক আচরণকারীকে পথভ্রষ্ট বলে ঘোষণা দেয়া হল।

ইমাম সাহেবের ফাযায়েল বা মহত্ব বর্ণনা করতে গেলে বিরাট কলেবরে বিশিষ্ট বই হয়ে যাবে। এখানে নমুনাস্বরূপ মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করা হচ্ছে।

হাফেজ যাহবী জনৈক ইমামের উক্তি বর্ণনা করে বলেন- ইমাম আবু দাউদ চাল-চলন, কথাবার্তা, আচার-আচরণে ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের সদৃশ, আহমদ বিন হাম্বল ওকী সদৃশ, ওকী সুফিয়ান সদৃশ, সুফিয়ান মনসুর সদৃশ, মনসুর ইব্রাহীম নখয়ী সদৃশ, ইব্রাহীম নখয়ী আলকামা সদৃশ, আলকামা হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ) সদৃশ, আর আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ ছিলেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সদৃশ।

ইদ্রীস বিন আব্দিল করীম মুকরী বলেন, আমি অনেক উলামায়ে কিরাম দেখেছি। যেমন হুশাইম বিন খারেজা, মুসআব যুবাইরী, ইয়াহইয়া বিন ময়ীন, আবু বকর বিন আবি শাইবা, উছমান বিন আবি শাইবা, আব্দুল আলা বিন হাম্মাদ নরসী, মুহাম্মদ বিন আব্দিল মালেক বিন আবি শাওয়ারেব, আলী বিন মদীনী, উবাইদুল্লাহ বিন উমর কাওয়ারিরী, আবু খাইছামা, যুবাইর বিন হরব, আবু মামার কুতাইয়বী, মুহাম্মদ বিন জাফর ওরকানী, আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন আইয়ুব, মুহাম্মদ বিন বাককার বিন রাইয়ান, উমর বিন মুহাম্মদ নাকে, ইয়াহইয়া বিন আইয়ুব মাকাবেরী, শুরাইহ বিন ইউনুস, খলফ বিন হিশাম বাযযায, আবুররবী যাহরানী প্রমুখ। এদের প্রত্যেকেই ইমাম সাহেবকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করতেন। সালাম করার জন্য তাঁর নিকট যেতেন।

মুহাম্মদ বিন আলী বিন শুয়াইব তার পিতার এ উক্তিটি বর্ণনা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণীটি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মধ্যে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

আমার উম্মতের মধ্যে ঠিক তদ্রুপই ঘটবে যেমনটি ঘটেছিল বনী ইসরাঈলে। এমনকি বনী ঈসরাইলের মতই কারও মাথায় করাত চালান হবে। কিন্তু এতে করেও তাকে দ্বীন থেকে সরান যাবে না।

যদি খলকে কোরআনের ফিতনায় ইমাম আহমদ বিন হাম্বল অটল না থাকতেন তবে তা কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের জন্য লজ্জার কারণ হত। এ ফিতনার অগ্নিকুণ্ডে অনেককেই বিদগ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ব্যতীত আর কেউ সে অগ্নিকুণ্ড থেকে বের হতে পারেনি।

কুতাইবা বিন সায়ীদ বলেন, যদি সুফিয়ান ছাওরী না হতেন তবে ‘তাকওয়ার’ মৃত্যু হয়ে যেত, আর যদি আহমদ বিন হাম্বল না হতেন তরে দ্বীনের মধ্যে বিদ’আতের সৃষ্টি হত। এতে আব্দুল্লাহ বিন আহমদ বিন শাবেবায়াহ বললেন, আপনি তো আহমদ বিন হাম্বলকে একজন তাবেয়ীর স্থানে নিয়ে পৌঁছিয়েছেন। কুতাইবা বললেন, আমি তাকে কিভাবে তাবেয়ীনদের সমপর্যায়ের মনে করি? ইমাম আহমদ বিন হাম্বল আমাদের ইমাম।

একবার ইয়াহইয়া বিন সায়ীদ কাত্তানের মজলিসে কেউ ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের উল্লেখ করলে তিনি বললেন, তুমি একজন মহাজ্ঞানীর উল্লেখ করলে।

আবু আসেমের মজলিসে একবার ফিকাহ সম্পর্কে আলোচনা হচ্ছিল। তিনি বললেন, বাগদাদে এক ব্যক্তিই আছেন। অর্থাৎ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল। তিনি ব্যতীত সেখান থেকে ফিকাহ সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোন আলেম আমাদের নিকট আসেননি। একথা ইয়াহইয়া বিন মদীনীর মজলিসে আলোচিত হলে তিনি তার সত্যতা স্বীকার করেন।

আহমদ বিন ইব্রাহীম দওরকী বলেন, তোমরা যদি কাউকে আহমদ বিন হাম্বলের বদনাম করতে দেখ, তবে মনে করে তার মুসলমান হবার বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সুফিয়ান বিন ওকী বলেন, আহমদ বিন হাম্বল আমাদের মতে সত্যের মাপকাঠি। যে ব্যক্তি তার দোষ তালাশ করে আমাদের মতে সে ফাসেক। 

আবু যুরআ রাযী বলেন, আহমদ বিন হাম্বলের এক লক্ষ হাদীছ মুখস্ত ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কিভাবে জানলেন? তিনি বললেন, আমি তার সাথে বিভিন্ন অধ্যায় এবং মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা করেছি। 

আবু বকর সাগানী বলেন, একবার আমি সিহাক বিন আবি ইসরাইলকে একথা বলতে শুনলাম, এখানে কেউ কেউ দাবী করেন যে, তারা ইব্রাহীম বিন সাদ থেকে হাদীছ শ্রবণ করেছেন। একথা দ্বারা তিনি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তখনই আমি ভেবেছি যে, আল্লাহ তাআলা ইসহাক বিন আবি ইসরাইলের পতন ঘটাবেন। পরে তাই হল। আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা হ্রাস করে দিয়েছেন এবং আহমদ বিন হাম্বলের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিয়েছেন।

আহমদ বিন সায়ীদ দারেমী বলেন, এ কালো চুলওয়ালা (অর্থাৎ আহমদ বিন হাম্বল) অপেক্ষা হাদীছের হিফয এবং তার মর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ অন্য কাউকে দেখিনি।

ইব্রাহীম হরবী বলেন, সায়ীদ বিন মুসাইয়্যেব তৎকালীন যুগে, সুফিয়ান ছাওরী সমকালীনদের মধ্যে এবং আহমদ বিন হাম্বল সমকালীনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন।

একবার আব্দুল্লাহ বিন দাউদ খুরাইবী বললেন, আওযায়ী স্বীয় যুগে সর্বোত্তম ছিলেন। অতঃপর আবু ইসহাক ফাযারী স্বীয় যুগে সর্বোত্তম ছিলেন। একথা শ্রবণে নসর বিন আলী বললেন, আর আমি বলছি আহমদ বিন হাম্বল স্বীয় যুগে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন।

মুহাম্মদ বিন হুসাইন আনমাতী বর্ণনা করেন, আমরা ইয়াহইয়া বিন ময়ীন, আবু খাইছামা, যুহাইর বিন হরব প্রমুখবিশিষ্ট উলামায়ে কিরামের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। তারা ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের ইলম ও মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তার প্রশংসা এবং গুণাবলী বর্ণনা করছিলেন। উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন বলল, এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা না করা চাই। এ কথা শুনে ইয়াহইয়া বিনময়ীন বললেন, তুমি আহমদ বিন হাম্বলের অধিক প্রশংসা পছন্দ কর না? আমরা যদি তার জ্ঞান, মহত্ব বর্ণনা করার জন্য পৃথকভাবে মজলিস কায়েম করি তবুও তা শেষ করা যাবে না।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, তিন ব্যক্তি এ যমানার আশ্চর্যজনক। প্রথমজন, একজন আরবী ব্যক্তি যে সঠিকভাবে কোন শব্দ পড়তে পারে না, এ হচ্ছে আবু ছওর। দ্বিতীয়জন এক অনারব ব্যক্তি যে একটি শব্দও ভুল করে না। এ হচ্ছে হাসান যাফরানী। তৃতীয়জন হচ্ছে একজন অল্প বয়স্ক যুবক; সে যদি কোন কথা বলে বয়স্করাও তা সঠিক বলে স্বীকার করে নেয়। এ হচ্ছে আহমদ বিন হাম্বল। বাগদাদে আমি তার চেয়ে বড় মুত্তাকী আলেম এবং ফকীহ কাউকে রেখে আসেনি। 

আবু বকর বিন আব্দিল্লাহ বিন যুবাইর হুমাইদী মক্কী বলেন, যতক্ষণ আমি হিজাযে থাকি, আহমদ বিন হাম্বল ইরাকে, এবং ইসহাক, বিন রাহওয়ে খোরাসানে থাকেন। আমাদের উপর কেউই জয়ী হতে পারে না।

একবার বিশর হাফী (রহঃ)কে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি বললেন, আমাকে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে? তাঁকে যেন ভাঁটিতে নিক্ষেপ করা হল আর তিনি লাল স্বর্ণে পরিণত হয়ে সেখান থেকে বের। হয়ে এলেন। 

ইমাম সাহেবের প্রিয় শাগরেদ আবু বকর মারওয়াযী একবার জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হলেন। লোকেরা তাকে বিদায় সংবর্ধনা জানানোর জন্য সামেরা নামক স্থান পর্যন্ত আসল। তিনি তাদেরকে ফিরে যেতে বললেও তারা সবাই ফিরে যায়নি। যারা ফিরে গিয়েছে তাদেরকে বাদ দিয়ে উপস্থিত লোকদের সংখ্যা হবে আনুমানিক পঞ্চাশ হাজার। লোকজন তাঁকে বলল, আপনি আল্লাহর শোকর আদায় করুন। এটা আপনার ইলমের প্রসিদ্ধির বরকত। তিনি কেঁদে উঠে বললেন, এটা আমার ইলম নয়। আহমদ বিন হাম্বলের ইলম।

ফিকাহ এবং ফতোয়ায় ইমাম সাহেবের উসুল বা মূলনী
এলামুল মুয়াক্কেয়ীন নামক কিতাবে ইবনে কাইয়্যেম উল্লেখ করেন, ফিকাহ এবং ফতোয়ায় ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের পাঁচটি উসুল ছিল।
প্রথম উসুল বা নীতি ছিল নসসে কাতয়ী বা অকাট্য নির্দেশ। এটা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তিনি অন্য কোন দলীল গ্রহণ করতেন না।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে সাহাবায়ে কিরামের ফতোয়া। যদি কোন ছাহাবীর এমন কোন ফতোয়া পেতেন যার বিপরীত অন্য কোন ছাহাবীর ফতোয়া নেই তবে সেটা অনুযায়ী আমল করতেন। কারও আমল, রায় কিংবা কিয়াসের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করতেন না।

তৃতীয় নীতি হচ্ছে, যদি ছাহাবায়ে কিরাম থেকে পরস্পর বিরোধী মত পেতেন তবে যেটা কোরআন এবং হাদীছের সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হত, সেটাকেই গ্রহণ করতেন। আর যদি সেগুলোর কোনটিই অন্যটি অপেক্ষা অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়ে সমপর্যায়ের হত তবে কোনটিকেই অগ্রাধিকার দিতেন না। এমতাবস্থায় তিনি তাঁদের মতপার্থক্য বর্ণনা করে দিতেন।
চতুর্থতঃ যদি উপরোল্লেখিত উসুলের কোনটিতে স্পষ্ট কোন নির্দেশ না পেতেন তবে মুরসাল হাদীছ এবং যয়ীফ হাদীছ থেকে নির্দেশ গ্রহণ করতেন এবং একে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দিতেন। যয়ীফ হাদীছ তার মতানুসারে হাদীছে ‘হাসান’ এর একটি প্রকার যা সহীহ হাদীছের বিপরীত। বাতিল হাদীছ কিংবা মুনকার হাদীছ অথবা যে হাদীছের রাবী সন্দেহযুক্ত সেগুলো তার। মতানুসারে যয়ীফ হাদীছের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রথম তিনটি উসুলের অবর্তমানে
পঞ্চমটি হচ্ছে কিয়াস। প্রথম চারটি দলিলের অবর্তমানে তিনি কিয়াস দ্বারা মাসয়ালার সমাধান বের করতেন। এটিকে তিনি কিয়াসের উপর প্রাধান্য দিতেন।

ইমাম সাহেবের প্রিয় ছাত্র খাল্লাল তাঁকে কিয়াস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বললেন, শুধুমাত্র প্রয়োজনের ক্ষেত্রেই কিয়াস দ্বারা মাসয়ালা বের করা যাবে।

ইবনে হানী বলেন, আমি একবার ইমাম সাহেবকে এ হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম

যে ফতোয়া দেয়ার ব্যাপারে অধিক সাহসী সে আগুনের অর্থাৎ জাহান্নামে প্রবেশের ব্যাপারে অধিক সাহসী।

তিনি বললেন, এ হাদীছ দ্বারা ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে যে এমন বিষয়ে ফতোয়া প্রদান করে যা সে শ্রবণ করেনি। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, যে ব্যক্তি এমন বিষয়ে ফতোয়া দেয় যার মধ্যে জটিলতা রয়েছে এবং যার সমাধান করতে সে অক্ষম। তিনি বললেন, এর পাপ ফতোয়া দানকারীর উপর বর্তাবে।

আবু দাউদ বলেন, এমন অনেক মাসয়ালা রয়েছে যেগুলোতে মতভেদ রয়েছে। আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে অসংখ্যবার বলতে শুনেছি ‘আমি জানি না’। তিনি বলতেন, আমি ফতোয়া দানের ব্যাপারে সুফিয়ান বিন উয়াইনা অপেক্ষা বড় আলেম আর কাউকে দেখিনি। তার জন্য আমি জানি না বলাটা খুবই সহজ ছিল। তিনি এতে বলতেন যে, পশ্চিমা এক ব্যক্তি এসে ইমাম মালেক বিন আনাসকে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করল, তিনি বললেন, আমি জানি না। সে বলল হে আবু আব্দিল্লাহ! আপনি বলছেন, ‘আমি জানি না’? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি মানুষকে বলো যে, আমি আমি জানি না একথা বলি। 

ইমাম সাহেবের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমি আমার পিতাকে অনেক মাসয়ালায়ই আমি জানি না’ বলতে শুনেছি। যে সমস্ত মাসয়ালায় মতপার্থক্য রয়েছে সেসব মাসয়ালায় তিনি নীরবতা অবলম্বন করতেন। বলতেন, অন্য কারও থেকে জেনে নাও। নির্দিষ্ট কারও নাম নিতেন না।
..
ইমাম সাহেবের ফতোয়া এবং মাসয়ালার সংকলন
ইমাম সাহেব কিতাব লিখাটা খুবই অপছন্দ করতেন। হাদীছ সংকলন পছন্দ করতেন। তার নিজস্ব মত, রায় কিংবা ফতোয়া লিখা থেকে তিনি ছাত্রদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। এমনকি এ বিষয়ে কোন কোন ছাত্রের লিখা দেখে। তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছিলেন, এসব মাসয়ালা থেকে আমি প্রত্যাবর্তন করলাম। একারণে ইমাম সাহেবের জীবদ্দশায় তার ফতোয়া ব্যাপক হয়নি। পরে তার ছাত্ররা সেগুলো সংগ্রহ করে। যেমন তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র আবু বকর খাল্লাল, ‘আল-জামেউল কবীর’ নামক বিশ খণ্ড বিশিষ্ট একটি কিতাবে সেগুলো সংকলন করেছেন। হুবাইশ বিন সিন্দী দু’খও বিশিষ্ট একটি কিতাবে তাঁর নাদির (দুষ্প্রাপ্য) মাসয়ালাগুলো সগ্রহ করেছেন।

ইমাম সাহেবের শাগরেদদের মধ্যে হাফেয আছরাম আসকাফী ‘কিতাবুস সুনান ফিল ফিকহি আলা মাযহাবে আহমদ ওয়া শাওয়াহিদুহু মিনাল হাদীছ’ নামক একটি কিতাব লিখেছেন।

আবু বকর আহমদ বিন মুহাম্মদ ফকীহ মারওয়ায়ী বাগদাদী ইমাম সাহেবের বিশিষ্ট শাগরেদদের মধ্যে একজন। দীর্ঘদিন তিনি ইমাম সাহেবের খিদমতে থেকে ইলম অর্জন করেন। তিনি ‘কিতাবুস সুনান বিশাওয়াহিদিল হাদীছ’ নামক একটি কিতাব প্রনয়ন করেন।

ফকীহ আবুল হাসান মায়মুনী রাফী ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের একজন বিশিষ্ট শাগরেদ ছিলেন। তিনি স্বীয় শহরের মুফতী এবং ফকীহ ছিলেন।

হাফেয হামদান বাগদাদী ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মেধাবী ছাত্রদের অন্যতম। জ্ঞানে-গুণে তিনি সবার নিকট সুপরিচিত ছিলেন। আবু ইসহাক ইব্রাহীম বিন ইয়াকুব দামেস্কের মুহাদ্দিছ’ হিসেবে সুপরিচিত। তিনিও আহমদ বিন হাম্বল হতে ফিকাহর জ্ঞান অর্জন করেছেন। তিনি দামেস্কের মিম্বরে বসে হাদীছ বর্ণনা করতেন। ইমাম সাহেবের সাথে চিঠি পত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল। তার চিঠি তিনি মিম্বরে বসে পড়ে সবাইকে শুনাতেন। হাফেয হরব বিন ইসমাঈল ইমাম সাহেবের বিশিষ্ট শাগরেদ ছিলেন।

এরা এবং ইমাম সাহেবের অন্য শাগরেদগণ তাঁর রায়, মত এবং মাসায়েল তাদের কিতাব এবং দরসী মজলিসের মাধ্যমে ব্যাপক করেছেন। ইমাম সাহেবের জীবদ্দশায় তাঁর মাসায়েল কিংবা ফতোয়া নিয়মিত ভাবে সংকলিত হয়নি। কারণ ইমাম সাহেব এবং তাঁর শাগরেদগণ হাদীছ রেওয়ায়েত করাকে প্রাধান্য দিতেন। ফিকাহবিদগণের পদ্ধতিতে মাসয়ালা গবেষণা করার বিষয়টি তাঁদের নিকট তত ব্যাপক ছিল না।

ইমাম সাহেবের বর্ণিত মাসয়ালাসমূহ আবু বকর খাল্লালের কিতাবে সর্বাধিক সংগৃহীত হয়েছে।

হাম্বলী মাযহাব প্রসার লাভ না করার কারণ 

শায়খুল ইসলাম আবুল ওফা আলী বিন আকীল বাগদাদীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় হাম্বলী মাযহাবের উলামায়ে কিরাম মাযহাবের প্রচার প্রসারে পিছিয়ে আছেন কেন? তিনি এর উত্তরে লিখেন, হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীগণ তুলনামুলক কঠোর প্রকৃতির, ফলে মানুষের সাথে মেলামেশা কম। বড়দের নিকট আসা-যাওয়া নেই। তারা বাস্তবপ্রিয়। যুক্তির বিপরীত হাদীছ গ্রহণ করেন। তাবীল বা ব্যাখ্যা থেকে বেঁচে থাকার জন্য তারা শব্দের কিংবা বাক্যের বাহ্যিক ও শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করেন। যৌক্তিক জ্ঞান থেকে তারা দূরে থাকেন। আয়াত ও হাদীছের ব্যাখ্যা না করে বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেছেন। তাই তাদের উপর তাশবীহ (আল্লাহকে মাখলুকের সাথে তুলনা করা) এর অভিযোগও আনা হয়েছে।

অন্য এক জায়গায় তিনি লিখেন, হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীরাই তাদের মাযহাবের উপর জুলুম করেছে। আবু হানিফা এবং শাফেয়ীর শাগরেদগণ কাযী পদে এবং অন্যান্য পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তারা শিক্ষা দেয়ার সুয়োগ-সুবিধা অনেক বেশী পেয়েছেন কিন্তু আহমদ বিন হাম্বলের শাগরেদদের মধ্যে সম্ভবত এমন কেউ নেই যিনি শিক্ষালাভের পর সরকারী কিংবা বেসরকারী কাজে আগ্রহী হয়েছেন। তাই তাদের ইলমী ধারাবাহিকতা খুবই কম প্রসার লাভ করেছে। অধিকন্তু যুহদ এবং কঠোরতার কারণে তারা লোকালয় থেকে দূরে ছিলেন। এতদভিন্ন ইমাম আহমদের শাগরেদদের মধ্যে যারা যুবক শ্রেণীর ছিলেন তারা ফিকাহ অর্জনে আগ্রহী ছিলেন। আর বয়স্কদের মধ্যে যুহদ এবং তাকওয়ার প্রভাব ছিল।

যুহদ এবং তাকওয়া

ইমাম সাহেব ছিলেন যাহেদ, মুত্তাকী এবং দুনিয়ার প্রতি অনীহাপ্রবন। এ সবগুণে ইমাম সাহেব তাঁর সমকালীনদের অগ্রণী ছিলেন। তাঁর পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। তিনি কোন আমীর, হাকেম কিংবা পদস্থ কর্মচারীর প্রতি ভ্রুক্ষেপও করতেন না। এমন কি তাদের হাদিয়া তোহফাও গ্রহণ করতেন না। তাঁর এসব দিক নিয়ে অনেকে কিতাবও রচনা করেছেন।

একবার ইমাম সাহেব তিনদিন পর্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলেন। ঘরে কোন খাবার ছিল না। তখন তিনি কোন প্রতিবেশীর ঘর হতে ধার হিসাবে কিছু আটা আনলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলেন বিধায় তার স্ত্রী তাড়াতাড়ি রুটি তৈরী করার ব্যবস্থা করলেন। সে মুহূর্তে পুত্র সালেহের উনূন জ্বলছিল। তিনি সেখান হতে রুটি পাকিয়ে নিয়ে এলেন।

ইমাম সাহেব তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এত তাড়াতাড়ি কিভাবে তৈরি করা হল? তিনি জবাবে বললেন, আপনাকে অত্যন্ত ক্ষুধার্ত দেখে সালেহের জ্বলন্ত তন্দুর হতে রুটি পাকিয়ে নিয়ে এসেছি।

ইমাম সাহেব বললেন, রুটিগুলো আমার সম্মুখ হতে নিয়ে যাও। আর আমার বাড়ী হতে আমার পুত্র সালেহের বাড়ীতে যাওয়ার যে দরজাটি রয়েছে তা আজ হতে বন্ধ করে দাও।

এর কারণ ছিল এই যে, ইমাম সাহেবের পুত্র সালেহ “মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ দলস্থ” লোকের অধীনে চাকুরি করতেন।

ইমাম সাহেবের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন একবার ইমাম সাহেব ক্রমাগত পনের-যোলদিন খলীফার সহচররূপে ছিলেন কিন্তু একদিনও খলীফার খাদ্য হতে কিছুই গ্রহণ করেন নাই। সে কয়দিন শুধুমাত্র ছাতু খেয়ে কাটিয়ে দেন। তাও তিনি খলীফার নিকট হতে অনেক দূরে গিয়ে খেয়ে নিতেন।

এ ঘটনার পর দীর্ঘ ছয়মাস যাবৎ ইমাম সাহেব শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। খলীফা মামুন কিছু স্বর্ণ মুহাদ্দেছগণের মধ্যে বিতরণ করার জন্য প্রেরণ করেন। প্রত্যেকেই তা গ্রহণ করলেন কিন্তু ইমাম সাহেব তা গ্রহণ করেননি। তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে দেন। বায়হাকী বর্ণনা করেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) কে একবার আল্লাহর উপর ভরসা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব কিছু থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার নাম আল্লাহর উপর ভরসা। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে যখন অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয় তখন জিব্রাঈল (আঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কোন প্রয়োজন আছে কি? হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বললেন, আমার প্রয়োজন আছে বটে। তবে আপনার নিকট আমার কোন প্রয়োজন নেই।

জিব্রাঈল (আঃ) বললেন, যাঁর নিকট আপনার প্রয়োজন তার নিকট চেয়ে নিন।

তিনি বললেন, ‘আল্লাহর নিকট যা পছন্দ আমার নিকটও তাই পছন্দ’।

ইমাম সাহেবের পুত্র হযরত সালেহ বলেন, ইমাম আহমদ (রহঃ) কারো নিকট থেকে অযুর পানি চেয়ে নেননি। তিনি নিজেই কূপে বালতি ফেলে পানি উত্তোলন করতেন। বালতি ভরে পানি উঠলে তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করে বলতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ’।

হযরত সালেহ বলেন, আমি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা কি পবিত্র কোরআনে বলেননি?

অর্থঃ যদি তোমাদের পানি শুকিয়ে যায় তবে কে আনবে তোমাদের জন্য প্রবাহমান পানি?

আবুল ফযল হতে বায়হাকী রেওয়ায়াত করেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) সেজদায় পড়ে দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! উম্মতে মুহাম্মদীর সমস্ত পাপীকে তুমি ক্ষমা করে দাও। আর তাদের আযাব আমাকে ভোগ করতে দাও।

একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এক যিম্মির নিকট একটি বড় বর্তন বন্ধক স্বরূপ রাখেন।

তিনি যখন তা ছাড়িয়ে আনতে গেলেন, তখন সে ব্যক্তি দু’টি বড় বর্তন এনে ইমাম সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত করল। উভয়টি দেখতে একইরূপ ছিল। কাজেই ইমাম সাহেব কোনটিই গ্রহণ করলেন না।

ইমাম সাহেবের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, খলীফা ওয়াছেকের খিলাফতের সময় আমরা বড়ই অভাবের মধ্যে কালাতিপাত করছিলাম। এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবের নিকট চিঠি লিখলেন, আমার নিকট চার হাজার দিরহাম আছে; আপনি তা গ্রহণ করে আমাকে কৃতার্থ করুন। ইমাম সাহেব অস্বীকৃতি জানালেন। সে ব্যক্তি অনেক পীড়াপীড়ি করল। কিন্তু ইমাম সাহেব স্বীয় সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। আমি এতে আফসুস প্রকাশ করলে ইমাম সাহেব বললেন, আমি তা গ্রহণ করলেও খরচ হয়ে যেতো। আবার আমাদের পূর্বাবস্থা দেখা দিত। এ সময় এক সওদাগর এসে আব্বাজানের খিদমতে দশ হাজার দিরহাম পেশ করলেন। তিনি এ অর্থ পূর্ব থেকেই তাঁর জন্য পৃথক করে রেখে দিয়েছিলেন। আব্বাজান তাও ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, আমরা ভাল অবস্থাতেই আছি। আল্লাহ আপনার শুভ কামনায় বরকত দান করুন।

এরপর অন্য এক ব্যবসায়ী এসে তাঁর খিদমতে ত্রিশ হাজার দিরহাম উপস্থিত করলেন। সেগুলোও প্রত্যাখ্যান করে তিনি সে স্থান ত্যাগ করলেন।

শিক্ষা সফরে ইমাম সাহেব যখন ইয়ামান ছিলেন তখন তিনি খুবই অভাব অনটনে ছিলেন। তাঁর শায়খ ছান’আনী তা অবগত হয়ে তাঁর হাতে কিছু দীনার গুঁজে দিতে চাইলেন। তিনি প্রত্যাখ্যান করে বললেন, আল্লাহ আমার প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন।

অর্থ সংকটের সময় এমনও দেখা গেছে যে, তাঁর পরিধানের বস্ত্র এমনভাবে ছিড়ে গিয়েছিল যে, তা আর পরিধানের যোগ্য রইল না। তিনি তখন ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রইলেন। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। লোকজন এর কারণ জানতে চাইলে তিনি সব কথা খুলে বললেন। এক ব্যক্তি তাঁকে একটি বস্ত্র দান করলে তিনি তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সে ব্যক্তি হতে এ শর্তের উপর কিছু অর্থ গ্রহণ করলেন যে, সে ব্যক্তি তাঁর দ্বারা কিতাব লিখিয়ে নিবেন। 

ইমাম আবু দাউদ বলেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) এর নিকট বসলে আখিরাতের অশেষ ফায়দা হত। তাঁকে আমি কখনো পার্থিব কোন লোভ-লালসার বশবর্তী হতে দেখিনি।

ইসমাঈল বিন ইয়াকুত বর্ণনা করেন, একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) তার বাড়ীতে হারেছ নামক জনৈক আলেমকে এনে দেওয়ার জন্য বললেন, আমি সানন্দে হারেছের খিদমতে গিয়ে দাওয়াত করলাম। তিনি তাঁর দল নিয়ে রাত্রে আগমন করলেন। তারা এশার নামাযের শুধুমাত্র ফরয পড়ে হযরত হারেছের চারপার্শ্বে বসে গেলেন। 

ইমাম আহমদ (রহঃ)ও একপাশে বসে পড়লেন। কিন্তু তার দলবলের কেউ তা জানতে পারেনি। তারা কেউ এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদও করেন নাই।

হযরত হারেছ বৈরাগ্য (যুহদ) সম্বন্ধে ওয়ায শুরু করলেন। তা প্রত্যেকের হৃদয়কে প্রভাবান্বিত করল। প্রত্যেকে অনেক ক্রন্দন করল।

বর্ণনাকারী বলেন, আমি ইমাম সাহেবের অবস্থা জানার জন্য তার নিকট গেলাম। দেখতে পেলাম তিনি ক্রন্দন করছেন। তিনি প্রায় বেহুশ হয়ে পড়েছেন।

হযরত হারেছ ফযর পর্যন্ত ওয়াজ-নছীহত করলেন। আর শ্রোতারা অধীর হয়ে ক্রন্দন করতে লাগল।

ইসমাঈল হযরত আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, তাকে আপনার কিরূপ মনে হল?

তিনি বললেন, খোদার কসম! বৈরাগ্য এবং আনুগত্য সম্বন্ধে অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলার জন্য তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আমি আর অন্য কাউকে দেখিনি। আর তাঁর দলের চেয়ে উত্তম জামাতও আমি আর দেখিনি। তবুও আমি মানুষকে তাদের সাহচর্য থেকে দূরে থাকার জন্য অনুপ্রাণিত করব।
ইমাম বায়হাকী বলেন, এ সম্বন্ধে নিষেধ করার কারণ এই ছিল যে, যদিও হযরত হারেছ একজন ইবাদত গুজার যাহেদ ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু তিনি ইলমে কালাম সম্বন্ধে আলোচনা করতেন যা ইমাম সাহেব মোটেই পছন্দ করতেন না। অধিকন্তু তিনি এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হত না।

কেউ কেউ এরূপ ধারণা করেন যে, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) লোকদেরকে হযরত হারেছের জমাত হতে দূরে থাকার জন্য এ কারণে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁদের আলাপ-আলোচনা কোন কোন সময় কাশফের সীমার বাইরেও চলে যেতো। আর হযরত হারেছ নফস সম্বন্ধে এমন কঠোর বিধানের পক্ষপাতী ছিলেন- যে সম্বন্ধে শরীয়তে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ সব কারণেই ইমাম সাহেব যখন আবু যুর’আকে হযরত হারেছের কিতাব অধ্যায়ন করতে দেখলেন, তখন তিনি বললেন, এ কিতাবে বিদ’আত রয়েছে। শরীয়তের পরিপন্থী অনেক বিষয়, এখানে স্থান পেয়েছে। আর যিনি তাঁকে কিতাবটি দিয়েছিলেন তাকে বললেন, যে পথ অনুযায়ী ছওরী, মালেক আওযায়ী, এবং লাইছ বিন সায়ীদ ছিলেন সে পথের অনুসরণ করুন। হারেছের পথ পরিহার করুন। কারণ এতে বিদআত রয়েছে।

ইমাম আহমদ (রহঃ) বলতেন, অভাব-অনটন সহ্য করার মধ্যে এক বিরাট মঙ্গল নিহিত রয়েছে। কিন্তু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের পক্ষেই তা থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব।

তিনি বলতেন, ঐশ্বর্যের চেয়ে দারিদ্র শত সহস্রগুণ শ্রেয়। কারণ এতে অতি উচ্চ পর্যায়ের ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। আর যে কোন নিয়ামত উপভোগ করে কৃতজ্ঞতা আদায় করার চেয়ে বহুগুণে উত্তম।

আখিরাতের ভয় ইমাম সাহেবের মধ্যে ঐরূপ প্রবল ছিল যে, এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি যে ইলম শিক্ষা করেছেন তা কি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করেছেন?

ইমাম সাহেব বললেন, আপনি যে প্রশ্ন করেছেন তার সদুত্তর দেয়া আমার পক্ষে বড়ই কঠিন কাজ। হ্যা, কতক বিষয় আমার নিজের জন্য পছন্দ করেছি এবং তা স্বীয় পক্ষে স্থান দিয়েছি।

ইমাম বায়হাকী বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি ইমাম সাহেবের খিদমতে এসে আরজ করল, আমার মাতা বড়ই কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত। আপনি তার রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করুন। তিনি কিছুটা বিরক্তির স্বরে বললেন, আমিই তো দোয়া পাওয়ার অধিক উপযুক্ত পাত্র। এরপর তিনি তার জন্য দোয়া করলেন।

সে ব্যক্তি বাড়ী এসে দরজায় আওয়াজ দিলে তার মাতা দরজা খুলে দিয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে আমার কঠিন রোগ হতে আরোগ্য দান। করেছেন।

ইমাম সাহেবের বুযুর্গী সম্বন্ধে এরূপ বহু ঘটনা রয়েছে।
একদা তিনি কোন এক ব্যক্তিকে খুশী হয়ে কোন একটি বস্তু দান করলেন। অপর এক ব্যক্তি অধিক মূল্য দিয়ে সেটা খরিদ করতে চাইল। এতে প্রথম ব্যক্তি বলল, শতগুণ অধিকমূল্য পেলেও আমি এটা বিক্রয় করতে রাজী নই। আপনি এটা দ্বারা যেরূপ বরকত লাভের আশা করে থাকেন আমিও সেরূপ আশা করে থাকি।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) যুহদ ও দুনিয়া বিরাগ সম্বন্ধে একটি কিতাব রচনা করেছেন। সে অতুলনীয় কিতাবের তোফায়েলে তিনি এমন উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছেন যা অতি অল্পসংখ্যক ভাগ্যবানের জন্যই জুটেছে।

জীবিকা নির্বাহ

ইমাম সাহেব উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর পিতা থেকে একটি বাড়ী এবং একটি টেক্সটাইল বা কাপড় তৈরির কারখানা লাভ করেন। তিনি সে বাড়ীতে বাস করতেন এবং কারখানা ভাড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বাড়ীর সামনে প্রশস্ত মাঠ ছিল। মাঠের উৎপাদিত ফসলে পূর্ণ বছরের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যেত। তা থেকে হযরত উমরের নির্ধারিত উশর ইত্যাদি আদায় করতেন।

একবার কেউ একজন তাকে তাঁর বাড়ী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এটা আমি পিতা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। কেউ যদি স্বপ্রমাণে এ বাড়ীর দাবী করে আমি তাকে তা দিয়ে দিব।

ইদ্রীস হাদ্দাদ বর্ণনা করেন, ইমাম সাহেবের মহল্লায় তাঁতীদের বসতি ছিল। দারিদ্রতার সময়ে তিনি সেখানে কাজ করতেন।

হাদিয়া তোহফা পরিহার
খলকে কোরআনের ফিৎনার পরে ইমাম সাহেবের সংসারে খুবই অভাব-অনটন চলছিল। এ সময়েও তাঁকে বিরাট অংকের হাদিয়া দেয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে দেন। তাঁর চাচা ইসহাক খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে, সেখানে পাঁচশ দিরহাম ছিল। তিনি ইমাম সাহেবকে বললেন, সংসারে অভাব-অনটন থাকা সত্ত্বেও আপনি এ হাদিয়া ফিরিয়ে দিলেন? তিনি বললেন, চাচা! এগুলো চাইলে আসত না, এগুলো প্রত্যাখ্যান করার কারণেই এসেছে।

ইমাম সাহেবের ছেলে সালেহ বর্ণনা করেন, যখন আমাদের সংসারে খুব অভাব-অনটন চলছিল, তখন একদিন আমার পিতা আসরের নামাযের জন্য উঠে গেলে তাঁর বসার চাটাই উঠালাম। ওর নীচে এ মর্মে একটি চিঠি পেলাম আবু আব্দিল্লাহ! আমি আপনার অভাব অনটন এবং ঋণের কথা জানতে পেরে অমুকের মারফতে চার হাজার দিরহাম পাঠাচ্ছি। সেগুলো দিয়ে আপনার ঋণ আদায় করে নিজেদের সংসার চালিয়ে নিবেন। এগুলো যাকাৎ কিংবা সদকা নয়। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে এগুলো পেয়েছি। আমি এ চিঠি পড়ে সে স্থানেই রেখে দিলাম। পিতা ঘরে আসলে জিজ্ঞেস করলাম। এটা কিসের চিঠি? একথা শুনে তিনি খুবই রাগান্বিত হলেন এবং বললেন, তুমি এর উত্তর এখুনি নিয়ে যাও। এরপর তার নামে লিখলেন, আপনার চিঠি পেয়েছি। আমরা সুখে শান্তিতেই আছি। আমরা যার নিকট ঋণী, তিনি আমাদেরকে বিরক্ত করছেন, পরিবার পরিজন নিয়ে আল্লাহর রহমতে সুখেই দিন কাটাচ্ছি। ঐ ব্যক্তি আবারও পূর্বের চিঠির মর্মে একটি চিঠি সহকারে ঐ অংকের দিরহাম পাঠিয়ে দিল। পিতা এবারও আগের মত উত্তর লিখে সেগুলো ফিরিয়ে দিলেন।

হাসান বিন আব্দিল আজীজ এক হাজার দীনার বিশিষ্ট তিনটি থলি এই বলে ইমাম সাহেবের নিকট পাঠালেন, এগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈধ সম্পদ। আপনি এগুলো গ্রহণ করে পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করুন। কিন্তু ইমাম সাহেব সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন।

একবার খলীফা মামুন তার দারোয়ানকে কিছু অর্থ দিয়ে বললেন, এগুলো মুহাদ্দিছদের মধ্যে বন্টন করে দাও। তারা অভাবের মধ্যে থাকেন। যাদেরকে সে অর্থ দেয়া হয়েছে, ইমাম সাহেব ব্যতীত প্রত্যেকেই কবুল করে নিলেন।

একবার ইমাম সাহেবের উস্তাদ ইয়াযীদ বিন হারুন তাঁকে পাঁচশ দিরহাম দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরে তিনি সেগুলো আবু মুসলিম এবং ইয়াহইয়া বিন ময়ীনকে দিয়ে দেন।

ইমাম সাহেবের পূত্র সালেহ বর্ণনা করেন, বাগদাদের জনৈক পোদ্দারের ছেলে পিতার শিক্ষা মজলিসে বসত। তিনি একদিন তাকে কাগজ কিনে আনার জন্য একটি দিরহাম দিলেন। সে কাগজ কিনে তার ভিতর পাঁচশ দীনার রেখে ঘরে দিয়ে গেল। পিতা ঘরে এসে কাগজ খুলতেই দীনারগুলো ছড়িয়ে পড়ল। তিনি ঐ ছেলের সামনে কাগজ এবং দীনার রেখে বললেন, এগুলো নিয়ে নাও। সে বলল, কাগজ তো আপনার। বহু অনুরোধের পরও সে ইমাম সাহেবকে দীনার গ্রহণে মোটেই রাজী করাতে পারল না।

আবু বকর মারওয়াযী বলেন, আমি ইমাম সাহেবকে বলতে শুনেছি যে, দারিদ্রতার সমতুল্য অন্য কিছু নেই। সালেহীনদের এক জামাতকে আমি এ অবস্থায় দেখেছি। আব্দুল্লাহ বিন ইদ্রীসকে বৃদ্ধাবস্থায় নিম্মমানের জুব্বা পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। আবু দাউদকে ছেঁড়া জুব্বা পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। তিনি মাগরেব এবং এশার মাঝে নামায পড়ছিলেন। ক্ষুধায় তিনি অস্থির ছিলেন। মক্কায় আবু আইয়ুব বিন নাজ্জারকে দেখেছি। তিনি দুনিয়ার আরাম আয়েশ ছেড়ে এ পথে এসেছেন। তিনি একজন আবেদ ছিলেন।

কাযীর পদ প্রত্যাখ্যান

ইমাম সাহেব যখন বাগদাদে ইমাম শাফেয়ীর নিকট শিক্ষা অর্জন করছিলেন, তখন খলীফা হারুনুর রশীদ ইমাম শাফেয়ীকে বললেন, আপনার নিকট যাদের আসা-যাওয়া আছে তাদের মধ্য হতে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে ইয়ামানের কাযীর পদে পাঠিয়ে দিন। পরদিন দরসী মজলিসে এসে ইমাম শাফেয়ী ইমাম আহমদকে বললেন, ইয়ামানের কাযীর পদের জন্য আমার সাথে খলীফার আলোচনা হয়েছে। উপযুক্ত লোক নির্বাচন আমার মর্জির উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ কাজের জন্য আমি আপনাকে নির্বাচিত করেছি। আমীরুল মুমেনীনের নিকট আপনার নাম প্রস্তাব করব। আপনি প্রস্তুতি নিয়ে নিন।

ইমাম সাহেব উত্তর দিলেন, আমি আপনার খিদমতে থেকে ইলম অর্জন করতে চাই। আর আপনি পরামর্শ দিচ্ছেন সম্রাটদের খুশী করানোর জন্য আমাকে কাযীর পদ গ্রহণ করতে। এ জবাব শুনে ইমাম শাফেয়ী চুপ হয়ে গেলেন।

খলীফা আমীন ইমাম শাফেয়ীকে খুবই ভক্তি করতেন। তিনি একদিন ইমাম শাফেয়ীকে বললেন, আমার এমন একজন লোকের প্রয়োজন যে বিশ্বস্ত এবং সুন্নাতের পাবন্দ। ইমাম শাফেয়ী বললেন, আমি এমন একজনকে জানি যিনি সুন্নাতের পাবন্দ, ফিকাহ এবং হাদীছ সম্পর্কে অভিজ্ঞ। খলীফা আমীন নাম জিজ্ঞেস করলে ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের নাম উল্লেখ করলেন। ইমাম সাহেব যখন এ সম্পর্কে জানতে পারলেন, ইমাম শাফেয়ীর নিকট গিয়ে বললেন, আপনি অন্য কোন বিশ্বস্ত লোক পাঠিয়ে দিন এবং আমাকে মাফ করুন। নচেৎ আমি শহর ছেড়ে চলে যাব।

খাদ্য এবং পোশাক

ইমাম সাহেব খুবই সাধারণ খানা খেতেন। প্রয়োজন মাফিক আয়োজন করা হত। এমন পোষাক পরিধান করতেন না যা প্রসিদ্ধির কারণ হবে কিংবা দ্বীনী এবং ইলমী ভাব-গাম্ভীর্য মাফিক হবে না।

মুহাম্মদ বিন আব্বাস বিন ওলীদ নাহবী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন,আমি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলকে দেখেছি। তিনি সুপুরুষ ছিলেন, মধ্যাঙ্গী ছিলেন। মেহেন্দীর খেযাব ব্যবহার করতেন। তবে দাড়ি খুব লাল করতেন না। তাঁর দাড়ির কয়েকটি চুল কালো ছিল। তাঁর কাপড় ছিল মোটা এবং সাদা। তিনি পাগড়ীও ব্যবহার করতেন। কখনও কখনও চাদরও ব্যবহার করতেন। সাধারণতঃ তার কাপড় সাদা তুলার হত। তা খুব মোটা কিংবা খুব পাতলা হত। অবশ্য পরে যখন তাঁর ছেলে বিত্তশালী হন, তখন তিনি নিজের আয় দ্বারা উত্তম পোষাক ব্যবহার করতে শুরু করেন।

একবার ইমাম সাহেব খলীফা মুতাওয়াক্কিল-এর নিকট গেলেন। তিনি তার মায়ের নিকট বললেন, তাঁর আগমন আমাদের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়। অতঃপর ইমাম সাহেবকে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করালেন। তখন তিনি, কাঁদতে কাঁদতে বললেন, সারাজীবন এদের থেকেই দূরে ছিলাম। আর মৃত্যুর সময় এ পরীক্ষায় পতিত হলাম সেখান থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সেগুলো খুলে ফেলেন।

একবার ইমাম সাহেবের মায়ের নিকট যথাযথ কাপড় ছিল না। ঐ সময় যাকাতের মাল আসলে তিনি সেগুলো এ বলে প্রত্যাখ্যান করে দেন যে, অন্যের সম্পদের ময়লা হতে বস্ত্রহীন থাকা ভাল। পৃথিবীতে কিছু কাল থেকে পরে চলে যেতে হবে।

ইয়াহইয়া নামক জনৈক ব্যক্তি অসিয়ত করেছিলেন যে, আমার গায়ের পোশাক আহমদ বিন হাম্বলের নিকট যেন পাঠিয়ে দেয়া হয়। তাঁর নিকট পোশাক আনা হলে তিনি এ বলে ফিরিয়ে দিলেন যে, এগুলো আমার পোশাক নয়।

ইমাম সাহেবের খাদ্য নিতান্তই সাধাসিধা ছিল। তবে তা এমন হত যদ্বারা দৈহিক, ইলমী এরবং রূহানী শক্তি বজায় থাকে।

পুত্র সাহেল বর্ণনা করেন, অনেক সময় আমার পিতাকে দেখেছি যে, তিনি রুটি টুকরো টুকরো করে পানিতে ভিজিয়ে নরম করে লবন দিয়ে খেয়ে নিতেন। তাঁকে কখনও ফল কিনতে দেখিনি। তবে তরমুজ, আঙ্গুর এবং খেজুর কিনে রুটি দিয়ে খেতেন।

খলীফা মুতাওয়াক্কিলের নিকট অবস্থানকালে একবার তার কয়েকজন বন্ধু এসে, মেহমান হলেন। তিনি তাদের আপ্যায়ন এবং দাওয়াতে সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয়, করে ফেললেন। এরপর বাগদাদ থেকে অর্থ আসা পর্যন্ত পনের দিন তিনি সাধারণ খাদ্যের উপর নির্ভর করেন।

ইবাদত এবং রিয়াযত

সলফে সালেহীনদের নিকট ইলম এবং আমল পরস্পর সম্পূরক ছিল। এর একটা অপরটার জন্য আবশ্যক ছিল। ইবাদত এবং রিয়াত ছিল ইলমের পরিচায়ক। ইমাম সাহেব এসব গুণে বাল্যকাল থেকেই সুপরিচিত ছিলেন।

ইব্রাহীম বিন শাম্মান বলেন, আহমদ বিন হাম্বলকে আমি বাল্যকাল থেকেই ভালরূপে জানি। ঐ সময় থেকেই সে রাত জেগে ইবাদত করত। পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমার পিতা প্রতিদিন তিনশ’ রাকাত নফল নামায পড়তেন। দোররা মারার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন রাতদিনে দেড়শ’ রাকআত নামায পড়তেন। ঐ সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় আশি বৎসর। প্রত্যহ কোরআন মজীদের সপ্তমাংশ পড়তেন। ইশার নামযের পর সামান্য কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতেন। এরপর জাগ্রত হয়ে সারারাত জেগে নামায পড়তেন।

একবার ইমাম শাফেয়ী, ইয়াহইয়া বিন ময়ীন এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বল একসাথে মক্কায় গমন করেন। সেখানে একই স্থানে তাঁরা অবস্থান করেন। রাত্রে ইমাম শাফেয়ী এবং ইয়াহইয়া বিন ময়ীন শুয়ে পড়লেন আর ইমাম আহমদ নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। সকালে ইমাম শাফেয়ী বলেন, রাত্রে আমি দু’শ মাসয়ালা সমাধান করেছি। ইয়াহইয়া বিন ময়ীন বলেন, আমি দু’শ হাদীছ মিথ্যাবাদী থেকে রক্ষা করেছি। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন, আমি নামযের মধ্যে কোরআন শরীফ এক খতম করেছি।

খলকে কোরআনের ফিৎনার সময় ইমাম সাহেব কিছুদিন ইব্রহীম বিন হানীর নিকট আত্মগোপন করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি আবু আব্দিল্লাহ হতে বড় আবেদ এবং যাহেদ দেখিনি। দিনের বেলায় রোযা রাখতেন। ইফতার তাড়াতাড়ি সেরে নিতেন। ইশার নামাযের পর কয়েক রাকআত নফল নামায পড়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতেন। এরপর জেগে অযু করে নামাযের মধ্যে সারারাত কাটিয়ে দিতেন। পরে এক রাকআত বেতেরের নামায পড়ে নিতেন। আমার নিকট যতদিন ছিলেন, ততদিন তাঁর আমল এরূপই ছিল। এর মধ্যে তিনি একদিন শিংগা লাগিয়েছিলেন। ঐ দিন রোযা রাখেননি।

আব্দুল্লাহ বলেন, একদিন আবু যুরআর পিতা আমাদের বাড়ীতে আসলেন। আমার পিতার সাথে তিনি ইলমী আলোচনা শুরু করলেন। আমার পিতা বললেন, আজ আমি শুধু ফরয নামায পড়েছি। আবু যুরকার সাথে আলোচনাকে আমার নফল নামাযের উপর প্রাধান্য দিয়েছি।

হজ্জ এবং যিয়ারত

ইমাম সাহেব পাঁচবার হজ্জ পালন করেছেন। তন্মধ্যে তিনবার পদব্রজে বাগদাদ থেকে মক্কায় যান। একবার হজ্জে মাত্র বিশ দিরহাম ব্যয় করেন। আবু বকর মারওয়াযী বলেন, একবার ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বললেন, কেউ কেউ হজ্জের সফরে মক্কা থেকে বাগদাদ পর্যন্ত মাত্র চৌদ্দ দিরহাম খরচ করেছেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হল তিনি কে? তিনি বললেন, আমি।

আব্দুল্লাহ বলেন, আমি আমার পিতাকে দেখেছি যে, তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চুল মুবারক মুখে লাগাতেন। সেগুলোকে চুমু খেতেন। দু’চোখের উপর রেখে দিতেন। সেগুলোকে পানিতে ডুবিয়ে পান করে আরোগ্য লাভ করতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেয়ালা মুবারক পানিতে ধুয়ে সে পানি পান করতেন। আমি কয়েকবার তাঁকে দেখেছি তিনি আরোগ্যের জন্য যমযমের পানি পান করেছেন এবং মুখমণ্ডল এবং দেহে ছিটিয়েছেন।

সালেহ বলেন, আমি অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পানি দিয়ে দো’আ পড়ে দম করতেন এবং বলতেন, এ পানি পান কর এবং হাত মুখ ধুয়ে নাও।

খলকে কোরআনের ফিতনা এবং ইমাম আহমদ

ইরাক সর্বদাই ফিৎনার ঘাঁটি ছিল। বাগদাদ শহর পত্তনের পূর্বে কূফা এবং বসরা ছিল এর কেন্দ্রস্থল। বাগদাদ পত্তনের পর সমস্ত ফিৎনার জড় সেখানে কেন্দ্রীভূত হয়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের যমানায় মু’তাযিলা, জাহমিয়্যা, কাদরিয়্যা, জবরিয়্যা, মুরজিয়্যা, সিফাতিয়্যা, মুশাব্বিয়্যা, মু’আত্তিলা প্রভৃত্তি দলের সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু খলীফা মামুন আব্বাসীর পূর্বে খিলাফতের পক্ষ হতে কোনরূপ সহযোগিতা পায়নি। বরং এদের দমন করার জন্য খিলাফত উলামাদের সহযোগিতা করেছে। ২১৮ হিজরীতে কাযী আহমদ বিন আবি দাউদ মু’তাযেলী খলীফা মামুনের সাথে ষড়যন্ত্র করে এ ফিৎতার আগুন ইসলামী বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। খলীফা মুতাসিম এবং ওয়াসিকও এ আগুনের ইন্ধন যোগায়। ২৩৪ হিজরীতে খলীফা মুতাওয়াক্কিল এসে এ ফিৎনার পরিসমাপ্তি ঘটায়। এ ষোল বৎসর উলামায়ে দ্বীন অগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকেন। ইসলামী আকীদায় দৃঢ় বিশ্বাসী হাজার হাজার লোক কারারুদ্ধ হন। নির্মম শাস্তি সহ্য করেন। অনেকে মৃত্যুবরণ করেন। এ ফিৎনার সময় ইমাম আহমদ বিন হাম্বল পূর্ণ ঈমানী শক্তি নিয়ে অটল থাকেন এবং মুসলমানদের ইজ্জত রক্ষা করেন।

ফিতনায়ে খলকে কোরআনের পটভূমি

খলীফা মামুন, মুতাসিম এবং ওয়াছিকের শাসনামলে ফকীহ মুহাদ্দিছদের বিপরীতে মুতাকাল্লিমীন, মুতাযিলীন এবং মুনহারিফীন তথা পথভ্রষ্টদের প্রাধান্য ছিল। সরকারী সহযোগিতাও তারা পাচ্ছিল। খলীফা মামুন রোম, ইরান এবং হিন্দুস্থান প্রভৃতি দেশ থেকে মানতিক, ফালসাফা এবং অন্যান্য অনেক শাস্ত্রের বই পুস্তক সগ্রহ করেন এবং এগুলো অনুবাদ করে প্রচার করেন। এর ফলে জনগণের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। উলামায়ে কিরামের প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভঙ্গিমায় সেগুলোর জবাব দিতে থাকেন। ঠিক এ সময়েই কাযী আহমদ বিন আবি দাউদ এবং খলীফা মামুন মিলে খলকে কোরআনের ফিত্নাকে একটি আন্দোলনের রূপ দেন।

কাযী আহমদ বিন আবি দাউদ বিজ্ঞ আলেম এবং বাকচতুর ব্যক্তি ছিল। মুতাযিলাদের প্রধান ওয়াসেল বিন আতার শাগরেদ হইয়াজ বিন আলা সুলামীর সংশ্রবে থেকে এ মতবাদের শিক্ষা গ্রহণ করে। স্বীয় যোগ্যতার কারণে মানুষের উপর তার বেশ প্রভাব ছিল। ফলে সহজেই সে খলীফা মামুনকে খলকে কোরআনের আকীদা প্রচার প্রসার করতে উদ্বুদ্ধ করে, যার মূলে ছিল ইয়াহুদী এবং খৃষ্টান। সে খলকে কোরআনের আকীদা বিশর মুরাইসী হতে, সে জাহম বিন সফওয়ান হতে, সে জাদ বিন দিরহাম হতে, সে আবান বিন সামআন হতে, সে লবীদ বিন আসমের ভাগিনা এবং তালুতের জামাতা হতে শিখেছিল।

এই সেই ইয়াহুদী লবীদ বিন আসাম যিনি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যাদু করেছিল। তাওরাত খলফ অর্থাৎ সৃষ্ট হবার আকীদা রাখত। তালুত ছিল একজন বদদ্বীন এবং যিন্দীক ব্যক্তি। সর্বপ্রথম সেই এ বিষয়ে বই লিখেছিল।

ইমাম সাহেবের বন্দীদশা এবং তাঁর উপর অত্যাচার 

ইসলামী আকীদা অনুসারে আল্লাহ তাআলার মত তাঁর কালাম অর্থাৎ কোরআনও অনাদি। কিন্তু ইবনে আবি দাউদ প্রশাসনের মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে এ আকীদা প্রচার করতে চাইল যে, আল্লাহ তাআলার কালাম অর্থাৎ কোরআন অনাদি নয় বরং মখলুক। এ আকীদা প্রচারের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হল, সঠিক নির্মল তাওহীদ প্রচারই এর লক্ষ্য। ২১৮ হিজরীতে খলীফা মামুন ইসলামী বিশ্বে এ নির্দেশ জারী করলেন যে, প্রত্যেক হাকেম এবং আমীর নিজ নিজ এলাকার আহলে ইলম থেকে এর স্বীকারোক্তি গ্রহণ করবে। অস্বীকার করলে উপযুক্ত শাস্তি দিবে এবং বন্দীদের রাজ দরবারে পাঠিয়ে দিবে।

বাগদাদের পুলিশ অফিসার ইসহাক বিন ইব্রাহীমকে এ মর্মে একটি চিঠি লিখা হল। সে সেখানকার বিশিষ্ট উলামায়ে কিরামদেরকে ডাকল। তন্মধ্যে ইমাম সাহেবও ছিলেন। তাদের সামনে খলীফার চিঠি পড়ে কোরআন মাখলুক অর্থাৎ সৃষ্ট বা নিত্য হওয়ার স্বীকারোক্তি নিতে চাইল। বলল, আপনি কি বলেন? ইমাম সাহেব বললেন, কোরআন আল্লাহর কালাম। সে জিজ্ঞেস করল, কোরআন কি মাখলুক? ইমাম সাহেব বললেন, কোরআন আল্লাহর কালাম। এর অতিরিক্ত আমি কিছু বলতে চাই না। এ কথায় ইসহাক তাকে জেলখানায় বন্দী করলেন। তাঁর সাথে আরও তিনজন মুহাদ্দিছ ছিলেন। দ্বিতীয় দিন যখন তাঁদেরকে বের করে এ প্রশ্ন আবার করা হয় তখন একজন তা স্বীকার করে নিল। ইমাম সাহেব এবং তাঁর দুই সঙ্গীকে জেলে পাঠানো হল। তৃতীয় দিনও এরূপ প্রশ্ন করা হল। এদিনও একজন স্বীকার করল। ইমাম সাহেব এবং তার সঙ্গী মুহাম্মদ বিন নূহকে তরসুসে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তরসুসের পথে ‘রহবায়ে তোক’ নামক স্থানে মুহাম্মদ বিন নূহ মারা যান। ইমাম সাহেব তার দাফন-কাফনের কাজ সম্পন্ন। করেন।

ইসহাকের সামনে যারা খলকে কোরআনের স্বীকার করেছিল তাদের ব্যাপারে মামুনকে বলা হয়েছিল যে জোর করে তাদের থেকে স্বীকৃতি আদায়, করা হয়েছে। মামুন তাদের প্রত্যেককে ডেকে পাঠালেন। ঐ সময় খলীফা বদন্দানী নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। মুহাদ্দিছীনদের বন্দী করে যখন রিক্কা নামক স্থানে আনা হল, তখন খলীফা মামুনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেল। ঐ সময় ইমাম সাহেব রিক্কার জেলখানায় ছিলেন। মামুন মারা যাওয়ার সময় তার পরবর্তী খলীফাকে এ বিষয়ে তাগিদ দিয়ে যান।

মামুনের পর মুতাসিম খলীফা নিযুক্ত হবার পর ইমাম সাহেবকে শৃঙ্খল পরিহিত অবস্থায় বাগদাদে আনা হল। কয়েকদিন বিভিন্ন স্থানে রাখার পর কিছুদিন একটি ভাড়াটে বাড়ীতে রাখা হয়। এরপর সাধারণ জেলখানায় রাখা হয়। এখানে তিনি শৃঙ্খলিত অবস্থায় অন্যান্য কয়েদীদেরকে নামায পড়াতেন। ২১৯ হিজরীর রমযান মাসে ইসহাক বিন ইব্রাহীমের বাড়ীর নিকট স্থানান্তর করা হয়। ইমাম সাহেব প্রায় আড়াই বৎসর পর্যন্ত জেলখানায় কালাতিপাত করেছেন। ঐ সময় খলীফা মুতাসিমও ইমাম সাহেবকে রাজদরবারে এনে খলকে কোরআন সম্পর্কে তর্ক বিতর্ক করে পুনরায় জেলখানায় পাঠিয়ে দিতেন। এরপর ইমাম সাহেবকে কোড়া মারা হয়। স্বয়ং খলীফার উপস্থিতিতে তার নির্দেশে জল্লাদ ইমাম সাহেবকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দিত। খলীফা সদয় হয়ে ইমাম সাহেবকে রেহাই দিতে চাইল। কিন্তু এ ফিৎনার জনক কাযী আহমদ বিন আবি দাউদ সেখানে উপস্থিত ছিল। সে খলীফাকে উত্তেজিত করে ইমাম সাহেবকে আরও শাস্তি দিল।

ইমাম সাহেব বর্ণনা করেন, তরসুস যাওয়ার পথে যখন আমরা রাত্রের বেলায় ‘রহবায়ে তোক’ নামক স্থানে পৌছলাম তখন এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের মধ্যে আহমদ বিন হাম্বল কে? লোকেরা আমার পরিচয় করিয়ে দিল। সে আমাকে লক্ষ্য করে বলল, ভয়ের কিছুই নেই। আপনাকে যদি হত্যা করা হয় তবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। ইনি ছিলেন রবীয়া গোত্রের গ্রামীণ কবি যাবের বিন আমের। ঐ সময় আরেক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে ইমাম সাহেবকে বলল, আহমদ! সত্যের পথে যদি মারা যাও তবে শহীদ হবে। আর যদি বেঁচে থাক তবে প্রশংসিত জীবন-যাপন করবে। ইমাম সাহেব বলেন, তার কথায় আমার অন্তর অনেক সুদৃঢ় হয়ে যায়। আবু হাতেম রাযী বলেন, ঐ গ্রাম্য লোকের কথাই ফলেছে। এ কষ্টের পরে ইমাম সাহেবের মর্যাদা অনেক বেড়ে গেছে।

যখন ইমাম সাহেবকে মুতাসিমের সামনে উপস্থিত করা হয় তখন সেখানে কাযী আহমদ বিন আবি দাউদ এবং আবু আব্দির রহমান শাফেয়ী উপস্থিত ছিলেন। ইমাম সাহেবকে মুতাসিমের সামনে বসান হলো। দরবারে উপস্থিত ব্যক্তিরা ইমাম সাহেবকে ভয় দেখাল। ইতিপূর্বে দুইজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। আবু আব্দির রহমানকে দেখে ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, মসাহ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ীর মত আপনার জানা আছে কি? এ কথা শুনে কাযী আহমদ বিন আবি দাউদ বলল, দেখ! এ ব্যক্তির গর্দান কাটার জন্য আনা হয়েছে আর সে ফিকাহর মাসয়ালা আলোচনা করছে।

ইমাম সাহেব বলেন, জেলখানায় আমার জন্য সবচেয়ে আতঙ্কের বস্তু ছিল কোড়ার শাস্তি। যত কষ্টই হোক জেলখানায় থাকা যায় আর মৃত্যু হচ্ছে সাময়িক কষ্ট। কিন্তু কোড়ার শাস্তি আমার নিকট অসহনীয় মনে হত। কিন্তু জেলখানার এক কয়েদী আমাকে বলল, এতে ভয়ের তেমন কিছু নেই। দু’কোড়ার পর আপনার অনুভবও হবে না যে, কোড়া কোথায় পড়ছে!

মুতাসিম বড়ই নির্দয়ভাবে ইমাম সাহেবকে কোড়া লাগিয়েছে। ঐ সময় ইমাম সাহেব রোযাদার ছিলেন। সর্বাঙ্গ রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা ২২০ হিজরীর রমযান মাসের শেষ দশকের।

ইমাম সাহেব স্বয়ং বর্ণনা করেন, আমাকে দুররা লাগানোর পর দীর্ঘ শ্মশ্রু বিশিষ্ট ব্যক্তি এসে আপন তরবারির বাট দ্বারা আমাকে প্রহার করল। আমি ভাবলাম যে, শান্তির সময় এসে গেছে। এ কষ্ট থেকে এখন আমি নিষ্কৃতি পাব। অর্থাৎ আমাকে হত্যা করা হবে। উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্য হতে ইবনে সামাআ নামক এক ব্যক্তি মুতাসিমকে বলল, আমীরুল মুমেনীন! তার গর্দান কাটা হোক। তার খুনের দায় আমার উপর। কিন্তু ইবনে দাউদ বলল, আমীরুল মুমেনীন! এমন করবেন না। এ ব্যক্তিকে যদি এখানে হত্যা করা হয় কিংবা মারা যায় তবে জনগণ বলবে আহমদ বিন হাম্বল ধৈর্যধারণ করে মারা গিয়েছে। তাকে নিজেদের নেতা বানিয়ে তার মতবাদের উপর অটল থাকবে। এ মূহুর্তে তাকে ছেড়ে দেয়াটাই উত্তম হবে। বাইরে গিয়ে মারা গেলে তার বিষয়টা মানুষের নিকট অস্পষ্ট থাকবে। মুতাসিম এ মতানুসারে কাজ করলেন। ইমাম সাহেবের চাচাকে ডেকে আনলেন। এরপর জনতাকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি একে চিন? সবাই উত্তর দিল হ্যা, ইনি হচ্ছেন আহমদ বিন হাম্বল। মুতাসিম বললেন, দেখ! এর দেহ অক্ষত আছে কিনা। সবাই বলল, হ্যা তার দেহ অক্ষত। এ ঘটনার বর্ণনাকারী আবু যুরআ বলেন, মুতাসিম আশংকা করছিলেন যদি এরূপ না করা হয় তবে হয়ত গণ-আন্দোলন শুরু হয়ে যাবে। যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। এভাবে তাঁকে নিষ্কৃতি দেয়ার ফলে জনগণের উত্তেজনা প্রশমিত হবে।

ইমাম সাহেবের পক্ষ হতে ক্ষমা প্রদর্শন

ইমাম সাহেব এ বিষয়ে যে ধৈর্য এবং দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন তা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। তাঁর দ্বীন হিফাযত করার জন্যই তিনি এসব কিছু সহ্য করেছেন। এরপর তিনি তার শত্রুদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার প্রহারকারীদের মধ্যে যারা মারা গিয়েছে, তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

তিনি বললেন, হাসান বসরীর তাফসীর থেকে একটা কথার মর্ম পেয়েছি যে, কিয়ামতের দিন সমস্ত উম্মতকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হবে এবং ঘোষনা দেয়া হবে যে, যার আজর বা প্রতিদান আল্লাহর জিম্মায় সে দাঁড়িয়ে যাও। তখন তারাই দন্ডায়মান হবে যারা দুনিয়াতে ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। এজন্য আমিও আমার প্রহারকারীদের মধ্যে যারা মারা গিয়েছে, তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এরপর ইমাম সাহেব বললেন, যদি কারও কারণে আল্লাহ কাউকে শাস্তি না দেন তবে এতে তার ক্ষতি কি? মুতাসিম যে দিন বাবল অথবা উমুরিয়া বিজয় করেন সেদিন ইমাম সাহেব বলেন, তাকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।

এক বর্ণনামতে ইমাম সাহেবের নিকট খলীফা ওয়াছিক তার পূর্ববর্তী খলীফা মুতাসিমের ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে লোক পাঠালেন। ইমাম সাহেব বললেন, আমি মুতাসিমের দরজা হতে বের হবার পূর্বেই তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

মুতাসিমের পর ২২৭ হিজরীতে ওয়াছিক খলীফা নিযুক্ত হন। কাযী আহমদ বিন দাউদ একেও খলকে কোরআনের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনিও উলামায়ে কিরাম এবং মুহাদ্দিছীনদেরকে কষ্ট দেন। কিন্তু আহমদ বিন হাম্বলকে কিছুই করেননি। কারণ তিনি আহমদ বিন হাম্বলের দৃঢ়তা এবং ধৈর্য দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাকে বিরক্ত করার ফল ভাল হবে না। অবশ্য তিনি ইমাম সাহেবের নিকট সংবাদ পাঠালেন যে, আপনি আমার শহরে থাকবেন না। এজন্য ইমাম সাহেব তার শাসনামলে বিভিন্ন শহরে আত্মগোপন করেছিলেন। পরে নিজ বাড়ীতেই নযরবন্দী অবস্থায় কালতিপাত করেন। ওয়াছিকের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ অবস্থায়ই ছিলেন।

এ যুগগুলোতে ইমাম সাহেব তাঁর অবস্থা বিশেষে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে হাদীছ শিক্ষা অব্যাহত রাখেন। এমনকি তিনি জেলখানায়ও শিক্ষা দান করেন।

ফিতনার সমাপ্তি

ওয়াছিকের পর ২৩২ হিজরীতে মুতাওয়াক্কিল খলীফা নিযুক্ত হন। তিনি এ ফিৎনার পরিসমাপ্তি ঘটান। তিনি মুতাযিলা, জাহমিয়া প্রভৃতি বাতিল ফিরকার মোকাবিলায় উলামা, ফুকাহা, এবং মুহাদ্দিছীনদের সহযোগিতা করেন। ২৩৪ হিজরীতে ফুকাহা এবং মুহাদ্দিছীনদের জন্য ওযিফা (ভাতা) নির্ধারণ করেন। তাদেরকে পুরস্কৃত করে এ নির্দেশ জারী করেন যে, তারা প্রকাশ্যে দরসী মজলিস কায়েম করবেন। মানুষকে হাদীছ শিক্ষা দিবেন। মুতাযিলা এবং জাহমিয়াদের রদ্দ করবেন। ২৩৭ হিজরীতে খলীফা মুতাওয়াক্কিল ইমাম সাহেবকে ডেকে পাঠান। কারণ মুতাওয়াক্কিলের নিকট ইমাম সাহেবের শত্রুরা সংবাদ পৌঁছিয়েছে যে, খিলাফতের উলবী দাবীদাররা ইমাম সাহেবের ঘরে আত্মগোপন করে আছে। কিন্তু পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁকে এ অপবাদ থেকেও নাজাত দেন।

অভিনন্দন

এ কষ্টের পর ইমাম সাহেব ‘ইমামুল মুহাদ্দিছীন’ ‘আন নাসের লিদ্দীন’ ‘আসসাবের ফিল মেহনা’ ‘আন্নাসের লিসসুন্নাহ’ ‘শায়খুল আসাবা’ ‘মুকতাদাত্তায়েফা’ প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত হন। তৎকালীন উলামায়ে কিরাম তাকে বিরাট ব্যক্তিত্ব হিসাবে চিহ্নিত করেন। আলী বিন মদীনী এমনও বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর দ্বীনের হিফাযতের জন্য আর কেউই আহমদ বিন হাম্বলের মত এগিয়ে আসেনি। মায়মুনী জিজ্ঞেস করলেন, আবু বকরও নয়? তিনি বললেন আবু বকরও নয়। আবু বকরের সাথে সাহায্যকারী-সহযোগী ছিলেন। আহমদ বিন হাম্বলের এও ছিল না।

রবী বিন সুলাইমান বলেন, মিশরে অবস্থানকালে ইমাম শাফেয়ী আমাকে একটি চিঠি দিয়ে বললেন, তুমি বাগদাদ গিয়ে আবু আব্দিল্লাহ থেকে এ চিঠির উত্তর নিয়ে এস। আমি চিঠি নিয়ে বাগদাদ পৌঁছলাম। ফজরের সময় আহমদ বিন হাম্বলের সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, আপনার ভাই শাফেয়ী মিশর থেকে এ চিঠি পাঠিয়েছেন। আহমদ বিন হাম্বল জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি এ চিঠি পড়েছেন। আমি বললাম, না। এরপর তিনি চিঠি খুলে পড়লেন। তার চক্ষু দুটি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আবু আব্দিল্লাহ! চিঠিতে কি আছে? তিনি বললেন, ইমাম শাফেয়ী লিখেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, তুমি আবু আব্দিল্লাহকে আমার সালাম লিখ। এও লিখ যে, অতি শীঘ্রই তুমি একটি পরীক্ষায় পতিত হবে। তোমাকে ‘খলকে কোরআনের’ তথা কোরআন সৃষ্ট হবার স্বীকার করতে বলা হবে। তুমি তা করবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তোমার ঝাণ্ডা সমুন্নত থাকবে।

রবী বিন সুলাইমান বলেন, চিঠি শুনে আমি বললাম, আবু আব্দিল্লাহ, মুবারক হোক। অতঃপর আহমদ বিন হাম্বল তাঁর দেহ হতে জামা খুলে আমাকে দিলেন। আমি চিঠির উত্তর নিয়ে মিশর পৌঁছলাম। ইমাম শাফেয়ীকে ইমাম আহমদের চিঠি দিলাম। ইমাম শাফেয়ী জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে কি দিয়েছে? আমি বললাম, তাঁর জামা উপহার দিয়েছে। তিনি বললেন, তা পানিতে ভিজিয়ে আমাকে পানি দাও। তদ্বারা আমি বরকত অর্জন করব।

ইন্তিকাল 

ইমাম সাহেব ২৪১ হিজরীর বারই রবীউল আউয়াল ইন্তিকাল করেন। ২রা রবীউল আউয়াল বুধবার রাত থেকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। নয়দিন তিনি অসুস্থ ছিলেন। ঐ সময় দলে দলে মানুষ তাঁকে সালাম করার জন্য এবং তার অবস্থা জানার জন্য আগমন করত। তাঁর অসুস্থতার সংবাদ যতই ছড়াতে লাগল, দর্শনার্থীদের সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পেতে লাগল। অলি-গলি এবং মসজিদে মানুষের ভিড় হতে লাগল। এমনকি সরকার দরজায় এবং গলিতে পাহারাদার বসাতে বাধ্য হল। বাগদাদের আমীর ইবনে তাহের ইমাম সাহেবের নিকট সালাম পাঠিয়ে তাঁর সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, আমি তা পছন্দ করি না। আমীরুল মুমেনীনও এ বিষয়ে আমাকে ক্ষমা করেছেন। বনু হাশেম গোত্রের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ আসলে তাদেরকে ভিতরে আসার অনুমতি দিতেন। কাযীদের একদল আসলে তাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। তখন জনৈক বুযুর্গ বললেন, আবু আব্দিল্লাহ! আল্লাহর সামনে হাযির হবার কথা স্বরণ কর। এ কথা শুনে ইমাম সাহেব ক্রন্দন করতে লাগলেন।

মৃত্যুর একদিন কিংবা দুদিন পূর্বে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, বাচ্চাদেরকে আমার সামনে আন। বাচ্চাদের একজন একজন করে ইমাম সাহেবের সামনে আসত। ইমাম সাহেব তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। ঐ সময় তাঁর অশ্রু বয়ে পড়ছিল।

ইমাম সাহেবের পুত্র হযরত ছালেহ বলেন, আমার পিতাকে কোন কিছু খাওয়ার ইচ্ছা আছে কি না জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি চিরকালের মতই অনাসক্তি প্রকাশ করলেন।

হযরত সালেহ ও আব্দুল্লাহ বলেন, ইমাম সাহেবের জীবনসায়াহ্ন ঘনিয়ে এসেছে। পরকালের দিকে প্রস্থান করছেন। এমতাবস্থায় তিনি বলে উঠলেন, দূর হও, দূর হও। মানুষ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কাকে দূর হতে বলছেন? তিনি বললেন, ঘরের কোণে ইবলিস বসে আছে। মনের দুঃখে সে নিজের আঙ্গুল কামড়াচ্ছে। সে আমাকে বলছে, আহমদ ক্ষণিকের জন্য তুমি আমার দিকে খেয়াল কর। আমি বললাম, আমি তোমার কথায় কর্ণপাত করতে মোটেই রাজী নই। যে পর্যন্ত আমার রূহ ঈমান সহকারে দেহ হতে বের না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার ব্যাপারে অসর্তক থাকব না।

এরপর ইমাম সাহেব বললেন, আমাকে অযু করাও। অজুর সময় বললেন, দেহের অমুক অমুক অংশ অতি উত্তমরূপে ধৌত কর। আবার বললেন, পায়ের অঙ্গুলিসমূহ খেলাল কর। ঐ মুহূর্তে তিনি অবিরাম আল্লাহর যিকরে মশগুল ছিলেন।

এরপরই তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। 

তাঁর ইন্তিকালের পর খলীফার প্রতিনিধি মুহাম্মদ বিন আব্দিল্লাহ বিন যাহের কয়েকজন গোলামসহ কাফন নিয়ে এলেন। ইমাম সাহেবের পরিবারস্থ লোকজনকে বললেন, এগুলো আমি খলীফার পক্ষ হতে এনেছি। তিনি যদি বাগদাদে থাকতেন তবে তিনি স্বয়ং এখানে উপস্থিত হতেন।

ইমাম সাহেবের পুত্র জানিয়ে দিলেন যে, ইমাম সাহেবের জীবদ্দশায় আমীরুল মুমিনীন তাঁকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। তিনি কখনো সেকথা ভুলতে পারেন নাই। এমতাবস্থায় খলীফার প্রদত্ত কাফন ব্যবহার করা আমি সমীচীন মনে করি না।

নাবালেগ শিশুদের বুনা কাপড় দ্বারা ইমাম সাহেবের কাফন দেওয়া হল। গোসল দেওয়ার প্রত্যেকটি বস্তু ক্রয় করে নেয়া হয়েছিল। এমনকি পানি পর্যন্ত ক্রয় করে নেয়া হয়েছিল। ইমাম সাহেবের পুত্ররা সরকারী চাকুরী করতেন বিধায় তিনি তাদের ঘরের আহার্যও গ্রহণ করতেন না। তাই তাঁর ইন্তিকালের পর তাদের ঘরের পানিও ব্যবহার করা হয় নাই। 

চৌ পায়ার নীচে তশতরীতে রক্ত ভরা ছিল। প্রস্রাবের নাম গন্ধও ছিল না। চিকিৎসক বললেন, চিন্তা-ভাবনার কারণে এরূপ হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিন অসুস্থতা বেড়ে গেল। রাত্রে আরও বৃদ্ধি পেল। শুক্রবার সকালে তিনি দুনিয়া জীবন ত্যাগ করেন। সারা বাগদাদে কান্নার রোল পড়ে গেল। জুমার নামাযের পর জানাযা বের করা হল। জানাযার নামাযে অস্বাভাবিক ভীড় হল। মাঠ ছাড়াও মানুষ দজলা নদীতে নৌকায় দাঁড়িয়ে অলিতে গলিতে বাজারে জানাযা পড়েছেন। আশে পাশে যারা ছিল তাদের বাদ দিয়ে আনুমানিক ছয় লক্ষাধিক লোক জানাযায় শরীক হয়েছিল।

মুসলমানদের মতই ইয়াহুদী, নাসারা এবং মজুসীরা ইমাম সাহেবের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছিল। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৭৭ বৎসর। এক সপ্তাহ পর্যন্ত মানুষ তার কবরের নিকট এসে জানাযা পড়েছিল।

সুসংবাদ 

ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, একবার বিশরে হাফী (রহঃ) কে স্বপ্নে আমি দেখতে পেলাম। তাঁর আস্তিনে কোন একটি বস্তু নড়াচড়া করছিল। আমি তাঁকে সে সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, রাতের বেলায় ইমাম আহমদের উপর মুক্তা ও ইয়াকুত বর্ষিত হয়েছিল। তন্মধ্য হতে আমিও কয়েকটি টুকরা কুড়িয়ে নিয়েছি। সেগুলো আমার আস্তিনে রেখে দিয়েছি।

ইবনুল জাওযী (রহঃ) বলেন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) কে আবু বকর মারওয়াযী স্বপ্নে দেখতে পেলেন যে, তিনি একস্থানে অতি আড়ম্বরপূর্ণ অবস্থায় উপবিষ্ট রয়েছেন। তার পরিধানে ছিল দুটি সবুজ রং-এর চাদর। তার মাথায় এমন একটি তাজ শোভা পাচ্ছিল, যাকে একটি নূরখণ্ডের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

তাঁর চলাফেরাও অভিনব ধরনের। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার চলাফেরা বড় অভিনব দেখছি। তিনি বললেন, দারুস সালামের অধিবাসীদের চালচলন এরূপই হয়ে থাকে।

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি এ তাজ কোথা হতে পেলেন? তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা অতি সদয়ভাবে আমার হিসাব গ্রহণ করে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তার দীদার উপভাোগ করার অনুমতি আমাকে দান করেছেন। আল্লাহ তাআলা আরও বলেছেন, হে আহমদ! এটা বড় সম্মানিত তাজ। তুমি পরম ধৈর্যের সাথে আমার কালামকে গায়রে মাখলুক (অনাদি) বলেছ এবং পুরস্কার হিসাবে তোমাকে এ তাজটি প্রদান করা হল।

হাফেয ইবনে হাজার আল আসকালানী (রহঃ) লিখেছেন, আবুল হাসান বলেন, যখন হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর কবরপার্শ্বে শরীফ আবু জাফর বিন আলী মুসার কবর খনন করা হচ্ছিল তখন ইমাম সাহেবের কবরের পার্শ্বও খুলে গেল। তখন দেখা গেল যে, তার কাফন পূর্বের ন্যায়ই অটুট রয়েছে। তাঁর পার্শ্বদেশও দেহ অক্ষত রয়েছে।

অথচ এটি হচ্ছে ইমাম সাহেবের ইন্তিকালের দু’শ ত্রিশ বৎসর পরের ঘটনা।

ইমাম বায়হাকী (রহঃ) ইবনে মুসআবের নিকট হতে শ্রবণ করেছেন যে, তিনি বলেছেন, আমি আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর খিদমতে উপস্থিত ছিলাম। ইত্যবসরে জনৈক বৃদ্ধ ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত হয়ে বললেন,

আপনাদের মধ্যে কার নাম আহমদ? ইমাম সাহেব বললেন, আমার নাম আহমদ। আপনার কোন প্রয়োজন আছে কি? বৃদ্ধলোকটি বললেন, আমি দীর্ঘপথ অতিক্রম করে আপনাকে সুসংবাদ প্রদান করতে এসেছি। আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছি। তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন যে, তুমি আহমদের নিকট গিয়ে বল, আরশের অধিপতি এবং ফেরেশতাগণ তার প্রতি সন্তুষ্ট। কারণ সে আল্লাহর রাস্তায় অসাধারণ এবং অতুলনীয় ধৈর্য প্রদর্শন করেছে।

আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মদ ইসকান্দারানী বর্ণনা করেন, ইমাম-আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর মৃত্যুতে আমার মনে বড়ই অনুতাপের সৃষ্টি হল। একদিন আমি তাকে স্বপ্নে দেখতে পেলাম তিনি বড়ই আনন্দ সহকারে কোথাও যাচ্ছেন। আমি তাকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন যে, শান্তি নিকেতনের অধিবাসীদের চালচলন এরূপই হয়ে থাকে। এরপর তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আল্লাহ তাআলা তার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এও জানিয়ে দিয়েছেন তুমি আমার কালামকে গায়রে মাখলুক (অনাদি) বলে প্রচার করেছ, এজন্য তোমাকে পুরস্কার স্বরূপ এসব প্রদান করা হয়েছে।

আমি তাকে বললাম, হে আহমদ! আপনি সুফিয়ান ছওরীর জন্য যেরূপ দোআ করেছেন আমার জন্য সেরূপ দোয়া করুন।

ইমাম আহমদ বললেন, আমি খোদা তাআলার নিকট আরজ করেছি, হে খোদা! আপনি আমার সমুদয় অপরাধ ক্ষমা করে দিন এবং আমাকে যেন কোন ঝুঁকি গ্রহণ করতে না হয়। আল্লাহ তাআলা বললেন, আহমদ! এটা বেহেশত। তুমি এতে প্রবেশ কর। আমি সেখানে গিয়ে সুফিয়ান ছাওরীকে দেখতে পেলাম। তিনি এক বৃক্ষ হতে অপরটিতে উড়ে যাচ্ছেন।

এরপর আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, বিশৃরে হাফীর সাথে কিরূপ ব্যবহার করা হয়েছে? তিনি বললেন, চুপ থাকুন। কে বিশরের সমকক্ষ হতে পারে? তাঁকে আল্লাহ তাআলার সম্মুখে রেখে এসেছি। তাঁর সামনে বড় একটি দস্তরখান বিছানো হয়েছে। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতি তাওয়াজ্জুহ দিয়ে বলেছেন, হে আমার বান্দা! তুমি আহার কর। কারণ তুমি দুনিয়াতে পরিতুষ্টভাবে আহার কর নাই। তুমি বিশ্রাম নাও। কারণ দুনিয়াতে তুমি আরাম-আয়েশ গ্রহণ কর নাই।

মুহাম্মদ বিন মুসলিম হতে বর্ণিত রয়েছে, আবু যুরআ যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন একদিন আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখতে পেলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহ তাআলা আপনার সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা আদেশ করলেন যে, তাকে আবু আব্দিল্লাহ এবং আবু আব্দিল্লাহ-এর সাথে একত্রে বসবাস করতে দাও।

ইমাম মালেক (রহঃ), ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) এবং ইমাম আহমদ (রহঃ)-এর কুনিয়াত ছিল আবু আব্দিল্লাহ

উসমান বর্ণনা করেন, আমি স্বপ্নে দেখতে পেলাম যে, কিয়ামত সংঘটিত হয়ে গিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বিচার করার জন্য সমাসীন হয়েছেন। আরশ হতে এক ঘোষক ঘোষণা করেছেন, আবু আব্দিল্লাহ, আবু আব্দিল্লাহ এবং আবু আব্দিল্লাহকে বেহেশতে প্রবেশ করাও। এর বিস্তৃত বিবরণ আমার পাশে দণ্ডায়মান এক ফেরেশতা হতে জানতে পেরেছিলাম।

সন্তান-সন্ততি

ইমাম সাহেব চল্লিশ বৎসর বয়সে বিবাহ করেন। তাঁর এক স্ত্রীর নাম আয়েশা বিনতে ফযল। তার ঘরে সাহেবজাদা সালেহ জন্মগ্রহণ করেন। তার ইন্তেকালের পর দ্বিতীয় স্ত্রী রায়হানাকে বিবাহ করেন। তার একটি চক্ষু ক্ষত ছিল। তার ঘরে সাহেবজাদা আব্দুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম সাহেব এক বাদী ক্রয় করেন। তার নাম ছিল হুসন। তার ঘরে সাহেবজাদী যয়নাব জন্মগ্রহণ করেন। সে ঘরে হাসান-হুসাইন নামে দু’জমজ সন্তান জনুগ্রহণ করেন। কিছুদিন পরেই তারা মারা যান। এরপর হাসান, মুহাম্মদ এবং সায়ীদ জন্মগ্রহণ করেন।

সাহেবজাদা সালেহ সবার বড় ছিলেন। ২০৩ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটকালেই পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তার উপর অর্পিত হয়। ইমাম সাহেব ব্যতীতও তিনি আরও কয়েকজন মুহাদ্দিছ থেকে হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তিনি ইস্পাহানের কাযী ছিলেন। সেখানেই ২৬৫ হিজরীর রমযান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। তার পুত্র যুহাইর ৩০৩ হিজরীতে এবং অপর এক পুত্র আবু জাফর মুহাম্মদ ৩৩০ হিজরীতে মারা যান।

ইমাম সাহেবের দ্বিতীয় পুত্র আব্দুল্লাহ তার পিতা থেকে সর্বাধিক হাদীছ রেওয়ায়েত করেন। তার অধিকাংশ কিতাব শ্রবণ করেছেন। ২৯০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। তৃতীয় পুত্র ইমাম সাহেবের মৃত্যুর দু’মাস পূর্বে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কূফার কাযী ছিলেন।

তাঁর অপর দুই পুত্র হাসান এবং মুহাম্মদ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানা যায়নি।

ঔরসজাত সন্তান ছাড়াও তাঁর অনেক রূহানী সন্তান ছিলেন। তাদের মাধ্যমে তাঁর ইলম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

ইমাম আহমদ (রহঃ)-এর ব্যক্তিত্ব ও কৃতিত্ব
ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) বলেন, বাগদাদের বুকে ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের চেয়ে ফিকাহশাস্ত্রে অধিক অভিজ্ঞ যাহেদ, মুত্তাকী এবং আলেম অপর কেউ আমার দৃষ্টিগোচর হয় নাই। 

ইয়াহইয়া বিন ময়ীন বলেন, আমি যদি সারাদিন ইমাম আহমদের প্রশংসা করতে থাকি তবুও তা শেষ হবার মত নয়।

অপর একজন ইমামের উক্তি, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। তিনি রাসূলে আকরাম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ এবং সাহাবায়ে কেরামের বাণীর পূর্ণ অনুসারী ছিলেন।

ইমাম সাহেবের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমার পিতা দিবারাত্রে তিনশত রাকাত নামায পড়তেন।

ইমাম হেলাল (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তাআলা এ সমস্ত ব্যক্তিবর্গদের সৃষ্টি করে উম্মতে মুহাম্মদীর অশেষ উপকার সাধন করেছেন।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) জন্মগ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছসমূহকে সহীহ ফিকাহ দ্বারা যাচাই করে দিয়েছেন।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) জন্মগ্রহণ করে নিখুত সত্যের পথিক সেজে সুস্পষ্ট সুন্নত পথকে দৌপ্যমান করে তুলেছেন।

ইমাম ইয়াহইয়া বিন মা’য়ীন সহীহ রেওয়ায়াতের ভিত্তি স্থাপন করে হাদীশশাস্ত্রকে সহজ করে তুলেছেন।

আলী ইবনুল মদীনী (রহঃ) যিনি ইমাম বোখারী (রহঃ)-এর শায়খ তিনি বলেন, আমাদের হাদীছ বন্ধুদের মধ্যে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ) সর্বোত্তম হাফেজুল হাদীছ।

ইমাম দায়কুত্নী (রহঃ)-এর এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রহঃ)-এর মৃত্যুর পর সুন্নতের রাশেদার প্রচার ও প্রসারে তাঁর সমকক্ষ আর কেউ জন্মগ্রহণ করেন নাই। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহঃ)-এর মৃত্যুর পর বিদ’আত দেশময় ছড়িয়ে পড়ে যা ইমাম সাহেবের জীবদ্দশায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।

তিনি এক লক্ষ হাদীছ হতে বাছাই করে মুসনাদে আহমদ’ নামক হাদীছ গ্রন্থটি রচনা করেন।

এছাড়াও তাঁর অনেক কিতাবাদি রয়েছে যেগুলো দ্বারা মুসলিম জগত বহু উপকৃত হয়েছে।

রচনাবলী

নীতিগতভাবে ইমাম সাহেব কিতাব লিখার পরিপন্থী ছিলেন। তিনি তাঁর মতামত এবং ফতোয়া শিখতে নিষেধ করতেন। তার রচনাবলী হাদীছ এবং আছর অর্থাৎ ছাহাবাদের বাণী সম্বলিত। তিনি ‘কিতাবুল মুসনাদ’, ‘কিতাবুত তাফসীর’, ‘কিতাবুন্নাসেখ ওয়াল মানসুখ’, ‘কিতাবুত্তারিখ’, ‘কিতাবু হাদীছে শুবা’, ‘কিতাবুল মুকাদ্দামা ওয়াল মুআখখার ফিল কোরআন’, ‘কিতাবু জাওয়াবাতিল কোরআন’, ‘কিতাবুল মানাসিকিল কবীর’, ‘কিতাবুল মানাসিকিস সগীর’, প্রভৃতি কিতাব রচনা করেন। কিতাবুল মুসনাদ তিরিশ হাজার হাদীছ সম্বলিত। কিতাবুত তাফসীরে একলক্ষ বিশ হাজার হাদীছ ছিল। 

ইমাম সাহেবের রচনাবলীর মধ্যে ইবনে নদীম নিম্নলিখিত কিতাবসমূহের নাম উল্লেখ করেন। 

কিতাবুল ইলাল, কিতাবুত তাফসীর, কিতাবুন্নাসেখ ওয়াল মনসুখ, কিতাবুযযোহদ, কিতাবুল মাসায়েল, কিতাবুল ফাযায়েল, কিতাবুল ফারায়েয, কিতাবুল মানাসেক, কিতাবুল ঈমান, কিতাবুল আশরিবা, কিতাবু তা’আতের রাসূল, কিতাবুররদ্দে আলাল জাহমিয়া, কিতাবুল মুসনাদ, এটিতে চল্লিশ হাজারেরও অধিক হাদীছ ছিল। 

মুসনাদে ইমাম আহমদ বিন হাম্বল সম্পর্কে ইমাম সাহেব তার সাহেবজাদা আব্দুল্লাহকে বলেন, তুমি মুসনাদের হিফাযত করো। এটি মুসলমানের ইমাম এবং মুকতাদা হবে। এতে চল্লিশ হাজার হাদীছ রয়েছে। তন্মধ্যে দশ হাজার হাদীছ মুকাররার (পুনরাবৃত্তি হয়েছে এরূপ) রয়েছে এগুলো বাদ দিলে তিরিশ হাজার হাদীছ হবে। এতে তিন শতাধিক ছুলাছিয়াত রয়েছে। ছুলাছিয়াত বলা হয় এমন হাদীছকে যেখানে মাত্র তিনজন রাবী রয়েছে।

একবার ইমাম সাহেবকে একটি হাদীছ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি বললেন, দেখ এটি আমার মুসনাদে রয়েছে কিনা। যদি না থেকে থাকে তবে এটি হুজ্জত তথা প্রমাণ নয়। তবে ইমাম সাহেব থেকে এরূপ কোন উক্তি নেই যে, মুসনাদের উল্লেখিত প্রত্যেকটি হাদীছই হুজ্জাত বা প্রমাণ। কয়েকটি হাদীছ এমন রয়েছে যেগুলো সহীহাইন অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম শরীফে রয়েছে কিন্তু মুসনাদে নেই।

ইবনে জাওযী মুসনাদে আহমদের পনেরটি হাদীছ মওযু অর্থাৎ বানোয়াট হবার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন। হাফিয ইরাকী এরূপ হাদীছের সংখ্যা নয়টি উল্লেখ করেছেন। হাফিয ইবনে হজর তার কিতাবে আলকওলুল মুসাদ্দাদ ফিব্বে আনিল মুসনাদ’ এ তিন চারটি হাদীছ ভিত্তিহীন বলেছেন।

শায়খ আবু হাসান বিন আব্দিল হাদী সিন্দী মাদানী মুসনাদে আহমদের একটি শরাহ (ব্যাখ্যা) লিখেন। শায়খ যয়নুদ্দীন উমর বিন আহমদ শাম্মা হলবী এ শরাহটি সংক্ষিপ্ত করেছেন। এটির নামকরণ করা হয় আদ্দুররুল মুনাদ্দদ মিন মুসনাদি। ইমাম আহমদ শয়খ সিরাজুদ্দীন উমর বিন আলী ইবনুল মুলানিও এটি আরো সংক্ষিপ্ত করেছেন। মিশরে একাধিকবার এটি ছাপা হয়েছে।

কতিপয় জ্ঞানের বাণী

বুযুর্গদের সাদাসিধা কথা বড়ই হাকীকত সমৃদ্ধ এবং হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে। সেগুলো বেশ ফলদায়ক হয়। অভিজ্ঞতা থেকে সেগুলোকে গ্রহণ করা হয়। ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের কয়েকটি বাণী নিম্নে উল্লেখ করা হল।

– ইলমে কালামের আলেম কখনও দ্বীন বুঝতে সক্ষম হয় না। তোমরা যদি কাউকে ইলমে কালাম সম্পর্কে আগ্রহী দেখতে পাও তবে জেনে রাখ, তার অন্তরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব এবং সন্দেহ অবশ্যই রয়েছে। 

– আমরা কখনও সাহাবায়ে কিরামের পরস্পরের মতবিরোধ কিংবা ঝগড়া নিয়ে ভাবি না। তাদের এসব বিষয় আল্লাহর উপর সোপর্দ করি।

– আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক শতাব্দীর শেষভাগে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য এমন এক ব্যক্তি সৃষ্টি করেন। যিনি তাদেরকে সুন্নত শিক্ষা দেন এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্য থেকে মিথ্যা এবং অপবাদ প্রতিহত করেন।

লিখা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য:
এই ইতিহাস সংগ্রহ করা হয়েছে “চার ইমামের জীবনী” গ্রন্থ থেকে। বইটি লিখেছেন, মাওলানা মতিউর রহমান, জামেয়া আরাবিয়া ফরিদাবাদ, ঢাকা। এটি প্রকাশ করেছে, মোহাম্মদী লাইব্রেরী, চকবাজার ঢাকা। এখানে আমার কোন মন্তব্য, তথ্য সংযোজন কিংবা বিয়োজন করা হয়নি।

Tags: জীবনী
Previous Post

উম্মুল মোমেনীন উম্মে সালমা (রাঃ)

Next Post

উম্মুল মোমেনীন মারিয়া কিবতিয়া (রাঃ)

Discussion about this post

নতুন লেখা

  • জ্বালানী তেল যেভাবে তৈরি হয়
  • শাহ পদবীটা বিরাট অদ্ভুত
  • তীর তথা ক্ষেপণাস্ত্র শক্তিতে বলিয়ান হতে স্বয়ং রাসুল (সাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন।
  • তসবিহ দানা বৃত্তান্ত!
  • হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী দেওবন্দি ও বেরেলভী আকিদার সূত্রপাত

এই সপ্তাহের জনপ্রিয় লেখা

No Content Available

নজরুল ইসলাম টিপু

লেখক পরিচিতি । গাছের ছায়া । DraftingCare

Facebook Twitter Linkedin
© 2020 Nazrul Islam Tipu. Developed by Al-Mamun.
No Result
View All Result
  • মুলপাতা
  • ধর্ম
    • ইসলাম
    • কোরআন
    • হাদিস
    • ডায়েরি
    • জীবনী
  • সাহিত্য
    • গল্প
    • রচনা
    • প্রবন্ধ
    • রম্য রচনা
    • সামাজিক
  • পরিবেশ
    • উদ্ভিদ জগত
    • প্রাণী জগত
    • ভেষজ হার্বাল
    • জলবায়ু
  • শিক্ষা
    • প্রাতিষ্ঠানিক
    • মৌলিক
    • ইতিহাস
    • বিজ্ঞান
    • ভ্রমণ
    • শিশু-কিশোর
  • বিবিধ
    • ঘরে-বাইরে
    • জীবন বৈচিত্র্য
    • প্রতিবেদন
    • রাজনীতি
    • তথ্যকণিকা
  • লেখক পরিচিতি

© 2020 Nazrul Islam Tipu. Developed by Al-Mamun.