চিঠিপত্রে স্বাক্ষর ও সিল এর যে ব্যবহার আজকের দুনিয়ায় আমরা দেখে থাকি। নিকট অতীতেও এটা সে ধরনের ছিলনা। কলম দিয়ে দস্তখতের যে ব্যাপকতা বর্তমানে চালু আছে, শুরুতে এই সুযোগ সবার জন্য অবারিত ছিলনা। দস্তখতের বিষয়টি পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল।
শুরুতে দস্তখতের কাজটি সিল মোহর দিয়ে চালানো হত। রাষ্ট্রীয় কাজ চালানোর জন্য ধাতব বিশেষায়িত সিল মোহর তৈরি করে ওজারতের (মন্ত্রীপরিষদের) গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বস্ত ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত থাকত। পত্র লিখার পরে সেখানে সিল বসিয়ে চিঠির পরিপূর্ণতা ঘোষণা করা হতো।
বর্তমানে চিঠিপত্রের শেষ দিকে যেখানে প্রেরক বা প্রতিষ্ঠানের নাম থাকে সেখানে দস্তখত ও সিল মারা হয়। আগেকার যুগে এই জায়গায় সিল মারার নিয়ম ছিলনা। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খলদুন তার মোকাদ্দিমা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, আগের জমানায় দস্তখত তথা সীলমোহরের ব্যবহার পত্রের উপরের দিকে থাকত। “যে পত্রের শুরুতে আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করে পত্র লিখা শুরু হত। সেখানেই সিল মারা হত। পরবর্তীতে সুলতানগন পত্র লিখার শুরুতে তাদের কিছু গুণকীর্তন যোগ করত। তখন সিল মোহরের দাগ সেখানেই মারা হত।”
আরো পড়ুন…
- সীল মোহরের প্রচলন ও রাসুল (সা) এর অলৌকিক মোহর
- আজীবন অর্থকষ্ট, অভাব যাদের নিত্য-বন্ধু
- দিল্লী ভ্রমণ – লাল কেল্লা পরিদর্শন
তদানীন্তন জমানায় সিল তৈরি করাও ছিল কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মূলত সিল-স্বাক্ষরের চিহ্নগুলো ধাতব খণ্ডে উল্টো করে এঁকে তারপর কাটতে হত। এটা অপেক্ষাকৃত কঠিন কাজ। দক্ষ-প্রসিদ্ধ কর্মকারেরাই এই কাজ করতে পারত। তাই হুবহু একই ধরনের, একই সাইজের আরেকটি সিল বানানো ছিল দূরহ। একটি রাজ্যের দূর প্রদেশের সকল সরকারী প্রতিষ্ঠানে এই সিলের ধরণ সম্পর্কে সম্যক ধারনা থাকত।
আর যাতে দ্বন্দ্ব সংঘাত বিস্তার হতে না পারে, সে লক্ষ্যে রাসুল (সাঃ) এর নাতি বিশিষ্ট সাহাবী হোসেন (রা) আমীরে মুয়াবিয়া (রা) এর সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে একটি প্রস্তাব পাঠালেন। আমীরে মুয়াবিয়া (রা) একটি সাদা কাগজের নীচে সীলমোহর বসিয়ে তার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে লিখেছিলেন, “তুমি, নীচে মোহরাঙ্কিত সংশ্লিষ্ট কাগজটিতে তোমার ইচ্ছেমত শর্তাদি লিখে নিতে পার; তা তোমার প্রাপ্য বলে বিবেচিত হবে।” (আল-মোকাদ্দিমা-৪৫৭) এই ধরনের সিল দ্বারা আমিরে মুয়াবিয়া (রা) নিজের পক্ষ হতে অগ্রিম নিঃশর্ত স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
রাবার আবিষ্কার হবার পরে সিল বানানো অনেক সহজসাধ্য হয়েছে। উপরোক্ত সিল বানানোর জন্য বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সামান্য অর্থের বিনিময়ে এখন যে কেউ একটি সিল বানিয়ে নিতে পারে। ফলে শুধুমাত্র সিলের উপর শতভাগ নির্ভরতা ঝুঁকিতে পড়ে যায়। তাই সিলের সাথে যুক্ত হয়েছে স্বাক্ষরের ব্যবস্থা। কেননা স্বাক্ষর নকল করাটা অনেকটা কঠিন ও দূরহ। তাই কোথাও নিজেদের কাগজপত্র সত্যায়ন করতে হলে স্বাক্ষর ও সিল এর সংযুক্তি করা বর্তমানে জরুরী। যা আগের যুগে প্রযোজ্য ছিলনা।


Discussion about this post