এমন সময় এক যুবককে খুব উৎসুক দৃষ্টিতে আমার বরাবর আসতে দেখলাম। সেই আমাকে জিজ্ঞাসা করল সম্ভবত আমি আপনাকে চিনি চিনি মনে হয়? বিবর্ণ ভাগ্য ও মরুচারী জায়েদ
আমার পরিচয় দিতেই সে সালাম করে বলল, স্যার! আমি আপনার ছাত্র মামুনের চাচাত ভাই ‘জায়েদ’।
নামটি সহসা মনে পড়লেও চেহারা মিলাতে ব্যর্থ হলাম। বহু বছর আগে দেখা, যখন সে ছোট ছিল। সবেমাত্র মাত্র মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছে। ঠিক এই মুহূর্তে যে ব্যক্তিটি আমার সম্মুখে দাড়িয়ে আছে, তার মুখ ভরা একগাল দাঁড়ি। অযত্ন অবহেলায় দাড়ির প্রতিটি কেশাগ্র নিজেদের ইচ্ছে মত চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। দুই হাতের দশ অঙ্গুলি দাড়ির জঙ্গলে ঢুকিয়ে যখন চিরুনির বিকল্প কাজ সারাচ্ছিল। তখন আর আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, কেন দাড়িগুলো তার চেহারার সাথে বিদ্রোহ করেছে। বিবর্ণ ভাগ্য ও মরুচারী জায়েদ
পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি, একথাটি সর্বাংশে সত্য হলেও কদাচিৎ পরিশ্রম পণ্ডশ্রমে পরিণত হয়। পরিশ্রম যখন পণ্ডশ্রমে পরিণত হয় তখন মানবজীবনে আসে রাজ্যের হতাশা। তৈরি হয় জীবনের প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা। সে ধরনের একটি উদাহরণ হল এই জা’লান বনী বু-আলীর অভিজ্ঞতা। এটা ওমানের একটি প্রত্যন্ত এলাকার নাম। আমাদের দেশের উপজেলা সদরের মত অফিসীয়াল কাজ কর্ম চলে। রাজধানী মাসকট থেকে প্রায় ৫ শত মাইল দূরে এর অবস্থান। আড়াই-শত মাইল মরুভূমি পাড়ি দিয়ে জা’লান পৌঁছতে হয়। নব্বইয়ের দশকের এই সময়ে এখানে চলার পথে কোন দোকান পাঠ গড়ে উঠেনি। প্রবাসীদের কেউ নিজেরা দোকান দিয়ে, নিজেদের কেনা জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করে, মুদির দোকান ও রেস্টুরেন্ট চালাত। পথে পথে উট ও গাধা ব্যতীত আর কিছু চোখে পড়েনা। বাংলাদেশ থেকে যুবকেরা নিজের পিতার গাঁটের টাকা খরচ করে, ভাগ্যকে জয় করার জন্য ওমানে কাজের সন্ধানে হাজির হয়।
আরো পড়ুন…
- সেই দুর্ভাগা মরুচারী
- ছাগলের আক্রমণে মরুর পাগল
- অন্ধ ভালবাসার বন্ধ দুয়ার – প্রবাসের যাতনা
দেশে থাকতে যে সমস্ত যুবক কায়িক পরিশ্রম করতে অভ্যস্ত ছিল, তারা যে কোন পরিবেশে কষ্ট করে মানিয়ে নিতে পারত। যারা বাপের ঘরে খেয়েছে, কখনও কাঁথা-বালিশ পর্যন্ত উল্টায়নি, তাদের হত যত দুর্দশা! এসব মানুষের অনেকেই দেশে থাকতে পারত পক্ষে কিছু করত না কিন্তু বিদেশের কঠিন জীবনকে উপলব্ধি করে, ঠিকই কঠোর পরিশ্রমের জীবনকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হয়। একসময় এসবের অধিকাংশই আফসোস করে বলে, হায়! দেশে থাকতে যদি বর্তমানের শ্রমের মত সামান্য একটা অংশ পরিশ্রম করতাম; তাহলে বিদেশের চেয়ে দেশেই প্রচুর অর্থকড়ি কামাতে পারতাম! বাড়ী ঘর বন্ধক রেখে, ব্যাংক থেকে কর্জ করে, ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন করার জন্য বিদেশে আসার পর, ফিরে যাবার পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ হয়ে যায়।
কোম্পানির কাজে আমাকে কখনও দেশটির খুবই প্রত্যন্ত এলাকায় যেতে হয়েছে। কোথায় থাকব, কোথায় রাত হবে, থাকার আদৌ কোন সুবিধা আছে কিনা, ভাবা-ভাবির সুযোগ ছিলনা। কাজের দায়িত্ব এসেছে, সেখানে পৌঁছে যেতে হবে। সেখানকার পরিবেশ, পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে নিজেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, রাত্রে কোথায় থাকা হবে কিংবা কিভাবে রাত কাটাতে হবে! দেশটির যেখানেই গিয়েছি সেখানেই বাংলাদেশীদের অবস্থান লক্ষ্য করেছি। অজানা, অচেনা মরু প্রান্তরের কিনারায় রাত হয়েছে তো কি হয়েছে? কাউকে প্রশ্ন করলে এখানে কোন বাংলাদেশী আছে? সর্বত্রই হ্যাঁ বোধক উত্তর। কেউ দেখিয়ে বলত, ওই জঙ্গলের পাশে ঘুপরি বানিয়ে কয়েকজন বাংলাদেশী থাকে। সেখানে গিয়ে দেখতে পারেন। তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে বললে, ভাই আজকের রাতে আপনাদের মেহমান হতে চাই। আমি এ ধরনের সমস্যায় পড়েছি। মেহমান বানানোর জন্য সবাই, সাথে সাথেই সবাই হুড়মুড় করে পড়বে। বলতে থাকবে অবশ্যই আমাদের সাথে থাকবেন। বহুদিন পরে দেশী ভাই পেয়েছি, পুরো রাত গল্প করব, দেশের কথা জানব, প্রয়োজনে আগামী কাল কাজেই যাবনা।
তারা তাদের সাধ্য মত আপ্যায়ন করবেই অধিকন্তু বিদায় বেলা আবার নিশ্চয়তা চাইবে যাতে করে আবার আসলে যেন তাদের এখানেই থাকি। এই ধরনের আতিথেয়তা আমি সব জায়গায় সমান ভাবে পেয়েছি! এখানে কোন চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সিলেটী কিংবা আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামায়াতী বলে কোন তফাৎ নাই। দেশী মানুষ হলেই সবাই সঙ্গ দিতে আসত।
১৯ই রমজান বেলা ১১টার দিকে মসজিদের সামনে বাংলাদেশী মুয়াজ্জিনের অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছি। এই মুয়াজ্জিনের কাছে ইতিপূর্বে আমি দু’বার মেহমান হয়েছিলাম। তার জন্য কিছু সংবাদ পত্র আনা হয়েছিল। আমার পড়ে ফেলা পুরানো বাংলা পত্রিকাগুলো, আরেকবার আসার সময় যাতে নিয়ে আসি, তিনি সে আবদার করেছিলেন। উল্লেখ্য আমার পঠিত দৈনিক পত্রিকাগুলো সর্বদা আমার সাথে গাড়ীতে রাখতাম। দূর দূরান্তে যেখানে যেতাম সেখানকার আগ্রহীদের পড়তে দিয়ে পরের সপ্তাহে যখন আসব তখন আবার সংগ্রহ করে নিয়ে যেতাম। পত্রিকাগুলোর অবস্থা তুলার মত না হওয়া অবধি এভাবে হাত বদল হত। এসব পত্রিকার কারণেও আমাকে অচেনা জায়গায় মানুষ কদর করত। দুই-তিন মাসের পুরানো পত্রিকা এমনকি তার চেয়েও বেশী দিনের পত্রিকা পড়ার মানুষের অভাব ছিলনা। সে সময়ের দুনিয়া বর্তমানের মত ডিজিটাল হয়নি। মানুষের হাতে তখনও মোবাইল আসেনি। টেলিগ্রাফে জরুরী কাজ চলত। তাই মানুষ দেশের সংবাদ পাবার জন্য এক বছরের পুরানো পত্রিকা দেখলেও চোখ বুলাত। কোন কোন জায়গা এমন ছিল দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বহুদিন পরেও জানতে পারত না। এ ধরনের কিছু পত্রিকা নিয়েই সেই পরিচিত মুয়াজ্জিনের জন্য অপেক্ষায়।
এমন সময় এক যুবককে খুব উৎসুক দৃষ্টিতে আমার বরাবর আসতে দেখলাম। সেই আমাকে জিজ্ঞাসা করল সম্ভবত আমি আপনাকে চিনি মনে হয়? বিবর্ণ ভাগ্য ও মরুচারী জায়েদ
আমি আমার পরিচয় দিতেই সে সালাম করে বলল, স্যার! আমি আপনার ছাত্র মামুনের চাচাত ভাই ‘জায়েদ’।
নামটি সহসা মনে পড়লেও চেহারা মিলাতে ব্যর্থ হলাম। বহু বছর আগে দেখা, যখন সে ছোট ছিল। সবেমাত্র মাত্র মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছে। ঠিক এই মুহূর্তে যে ব্যক্তিটি আমার সম্মুখে দাড়িয়ে আছে, তার মুখ ভরা একগাল দাঁড়ি। অযত্ন অবহেলায় দাড়ির প্রতিটি কেশাগ্র নিজেদের ইচ্ছে মত চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। দুই হাতের দশ অঙ্গুলি দাড়ির জঙ্গলে ঢুকিয়ে যখন চিরুনির বিকল্প কাজ সারাচ্ছিল। তখন আর আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, কেন দাড়িগুলো তার চেহারার সাথে বিদ্রোহ করেছে।
তার চেহারাটা ঠিক কেমন ছিল, অতীতের স্মৃতি থেকে তল্লাশি করতে রইলাম। গোলগাল চেহারার সেই বালকটির কথা এখনও মনে আছে। একদিন তাদের ঘরে আমার দাওয়াত ছিল। খানা শেষে একটি শক্ত খাদ্য কণা দাঁতের দূরহ স্থানে আটকা পড়েছিল। তাকে বলেছিলাম একটি দাঁতের খিলাল নিয়ে আসতে। সে বাহিরে গেল এবং পর মুহূর্তেই একটি খিলাল নিয়ে হাজির হল। খিলালটি মুখে দেবার আগে ভাবলাম এটা এত অমসৃণ কেন? প্রশ্ন করেছিলাম কোথা থেকে এনেছ? “সে গৌরবের সাথে উত্তর দিল বাহিরের উঠান পরিষ্কার করার নারিকেলের ঝাঁটা থেকে খুলে এনেছি”! হায় আল্লাহ আমার তো বড় সর্বনাশ হতো। ছেলেটি একটু বেকুব ধরণের হলেও স্বভাবে সোজা ও দয়া পরবশ হৃদয়। কিন্তু আমার সামনে যে দাড়িয়ে আছে, এত বছর পরে তো আর মিল থাকার কথা নয়। এত সব ভাবতে সর্বসাকুল্যে দশ সেকেন্ডের মত সময় নিলাম।
তার ঠোঁটের উপরের মোচগুলো বাঁকা হয়ে মুখের ভিতরে ঢুকতে চায়। মাথায় ধূলি ভর্তি এক পাগড়ি, চেহারাটা বিদঘুটে।
ভাবনার ছেদ ঘটার আগেই সে বলে উঠল আমাকে এখনও চিনেন নাই! তারপর সে নিজেই সেই খিলালের উল্লেখ করে, একটা উট্টহাসি দিয়ে আমাকে জাপটে জড়িয়ে ধরল!
তার শরীর থেকে নির্গত এক বিদঘুটে দুর্গন্ধ আমাকে কাহিল করে তুলল। নতুন একটি তাজা নিঃশ্বাসের জন্য ফুসফুস হাঁস-পাস করছিল কিন্তু কোন মতেই তা পারছিলাম না! শরীরের সমুদয় লোমকূপ রী রী করে খাড়া হয়ে গেল। মনে হল এখুনি বুঝি এক বালতি বমি হবে। দীর্ঘক্ষণ পায়ের মোজার দুর্গন্ধ সহ্য করার মত বীরত্ব আমার ছিলনা। কিন্তু এর তো দেখি পুরো শরীরের কাপড়গুলোই যেন বিরাটকায় পায়ের মোজায় পরিণত হয়েছে। বীভৎস দুর্গন্ধের পাল্লায় আবদ্ধ হয়ে ভাবলাম, শেষাবধি পাগলের খপ্পরে পড়লাম নাকি? যাক, কোনমতে তার দুর্গন্ধময় আন্তরিক আলিঙ্গন থেকে নিজেকে উদ্ধার করলাম। অতঃপর খোলা বাতাস থেকে একটি ফ্রেশ শ্বাস নিলাম। নতুন করে বুঝতে পারলাম আহা পৃথিবীর বাতাস কত সুমধুর। ভাবলাম, জান্নাতের গুরুত্ব ও মূল্য বুঝার জন্যই সম্ভবত সবাইকে জাহান্নামের উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। নতুবা মানুষ সহজে জান্নাতে চলে গেলে সেটাকেও মূল্য দিবে না। যাক, সেটা ভিন্ন কথা। বিবর্ণ ভাগ্য ও মরুচারী জায়েদ
জায়েদ প্রশ্ন করল স্যার! এখানে কি একটু গোসল করার যায়গা হবে? আমি বিগত ২০ দিন গোসল করতে পারিনি। তাই কাপড় চোপড় পরিষ্কার করতে পারিনি। এমনকি মুখে পানি ঢুকিয়ে ভাল করে কুলিও সাড়তে পারিনি। এখন আমার নিজের মুখের বিশ্রী গন্ধে যেন, আমিই বেহুশ হয়ে পড়ব। কাপড় ধোয়া, গোসল করা ও আনুষঙ্গিক কিছু কাজের জন্য আমার হাতে সর্বোচ্চ দু’ঘণ্টা সময় আছে; এই বিপদে আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করবেন?
চিন্তা করলাম, আমি নিজেও এ এলাকায় একজন আগন্তুক। তাছাড়া জায়েদ আমার ব্যাপারে এখনও একটি প্রশ্নও করেনি। জানতে চায় নি আমিই বা এখানে কি করি? সে তার কথাই একাধারে বলে চলেছে। হয়ত সে ভেবেছে আমি বোধহয় এখানেই থাকি। তাপরও চিন্তা করলাম তাকে কিভাবে সুযোগ করে দেয়া যায়। মাথায় আসল মুয়াজ্জিন সাহেবকে ধরি। তিনি হয়ত কিছু একটা করতে পারবেন। মুয়াজ্জিন সাহেবকে পেয়েও গেলাম তবে তার কাছে গোসল করার সুযোগ হলনা। কেননা ইতিমধ্যে মসজিদে মুসল্লি আসা শুরু হয়েছে গেছে। মুয়াজ্জিন সাহেবকে জোরাজুরি করাতে তিনি কিভাবে একটি বন্ধ বাসার চাবি এনে আমাকে দিয়ে বললেন, ২০ মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ করে বের হতে হবে। বাড়ীর মালিক আসবেন তিনিও গোসল করবেন, জোহরের নামাজ পড়বেন। যাক জায়েদ খুব খুশী হল এবং সে তার কথা রাখল। ২০ মিনিটের মধ্যে গোসল করা, কাপড় ভিজানো সহ যা না করলে নয়, তাই করে ফিরে আসে।
তার চেহারা দেখে মনে হল সে অনেকটা সতেজ হয়ে উঠেছে। তখনই তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম। তোমার এ অবস্থা কেন? সে তার না বলা কথা শুরু করল, চলুন ঘটনাটি তার মুখেই শুনি,
স্যার, আল্লার প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা জানাই নি বলেই আজকে আমার এই পরিণাম। আমি মাদ্রাসায় সামান্য পড়েছিলাম, পরে লেখাপড়া বন্ধ করে ওমানে চলে আসি। রাজধানীতে দর্জি হিসেবে এতদিন কাজ করছিলাম, ভালই চলছিল। টাকার অভাবে বোনের বিয়ে বারবার পিছনে যাচ্ছিল। ধার-কর্জ করার চিন্তা করছিলাম তাও হয়ে উঠেনি। আবার সামান্য বেতনের আয় দিয়ে বোনের বিয়ে দেওয়াটা দুঃসাধ্য ছিল। বারবার বিয়ে পিছানোর কারণে, বোনের হবু বরকে হারিয়ে ফেলার উপক্রম হচ্ছিল! ভাবছিলাম কিভাবে সামান্য আয় বাড়ানো যায়।
একদিন দোকানে এক অদ্ভুত চেহারার বেদুইন এসে হাজির হল। তার সারা শরীর থেকে ঘামের দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল।


Discussion about this post