মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ডাক্তার জাফর উল্লাহ চৌধুরী, তাঁর ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তা নিয়ে খোলামেলা সাবলীল কিছু কথা বলেছেন। তার কথার মধ্যে হিংসা, লুকোচুরি কিংবা ভিন্ন কোন মতলব ছিল বলে মনে হয়নি। তিনি এতদিন অন্তরে যা বিশ্বাস করতেন, যার কোন সদুত্তর তিনি মিলাতে পারেন নাই, সে সব কথাগুলো অকপটে জিজ্ঞাসা করেছেন। অনেকে তার এমন কথার ধরণে রুষ্ট হয়েছেন। কেউ তার ধর্ম জ্ঞান, ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ ট্রল করেছেন! বামপন্থার নেতিবাচকতা ও ইসলাম
মূল কথা হল, তিনি খোলামেলা ভাবে কথাগুলো বলেছেন বলে আমাদের কারো কাছে এগুলো বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে কিন্তু আমরা পুরোপুরিই বেখেয়াল যে, বামপন্থি মতাদর্শের ব্যক্তিরা এ ধরনের বহু প্রশ্নই ছাত্র, শিক্ষার্থী, তরুণ, যুবক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কাছে সরবরাহ করে থাকেন। সে সব প্রশ্নের তালিকা আহামরি অনেক লম্বা, এমন নয়। ত্রিশ থেকে চল্লিশের মত হবে। এসব প্রশ্নগুলো যখন সাধারণ মানুষের কাছে উত্থাপিত হয় তারা সেগুলোকে সঠিক, যুক্তি সঙ্গত ও যুতসই মনে করে। আমাদের শ্রদ্ধেয় ডাক্তার সাহেবের প্রশ্নগুলোও সেই লিস্টেরই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তার উপর ক্ষিপ্ত হচ্ছি কেন? তলে তলে লাখো তরুণের মগজ যে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে, সেটা আমরা ডাক্তার সাহেবের উপলব্ধি থেকেই বুঝতে পারছি। এটাই বা কম অর্জন কিসে। বরং এক্ষেত্রে করণীয় কি সেটা নির্ধারণ করাই বেশী জরুরী হয়ে পড়েছে।
দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও পরিসংখ্যান সহ এমন কিছু বিষয় আছে যা সারা বিশ্বে সমাদৃত এবং কার্যকর পজিশনে বসে আছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বটে। প্রতি বছর হাজারো বিদ্বান সৃষ্টি হয় এসব বিষয় থেকে। ধর্মের প্রতি নিক্ষেপিত প্রশ্নগুলো উপরোক্ত বিষয় দিয়ে বিবেচনা করতে গেলেই সে ব্যক্তিকে খোদা-দ্রোহী, নাস্তিক বলে মন্তব্য শুনতে হয়। কিন্তু আলেমেরা যদি এই বিষয়গুলোতে বুৎপত্তি অর্জন করে, তাহলে একই অস্ত্র দিয়েই তাদের প্রশ্নগুলোকে যথা-স্থলেই প্রতিহত করা যায়। ইসলামের ব্যাখ্যা দিতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ব্যবহার বহু পরেই সৃষ্টি হয় কিন্তু তার আগে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা প্রভাব সৃষ্টি করে বসে! সময়ের এই ব্যবধানে প্রচুর মানুষ দুদোল্যমানতায় পড়ে যায়। মুসলিম হিসেবে থাকেনা, যা আজকের সমাজে আমরা দেখতে পাই।
যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন কি তাহলে খুব খারাব বিষয়? উত্তর হবে মোটেও না। বরং সেটাকে ধরতে হবে মজবুত করে। তবে এক্ষেত্রে একটু ঝামেলা আছে! যুক্তিবিদ্যা যেহেতু প্রশ্ন নির্ভর, সেহেতু দৃশ্যত এসবকে ধর্ম-বিদ্বেষের মত লাগে। যেমন, জাফর-উল্লাহ প্রশ্ন করেছিলেন, “স্বয়ং রাসুল (সা) বিধবা বিয়ে করেছিলেন কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীরা বিধবা হলে, তাঁদেরকে কেন বিয়ে করা যাবে না বরং তাদেরকে মা বানিয়ে নেয়া হল!” শয়তানকে কষে গালি দেওয়া যেতে পারে কিন্তু এই প্রশ্ন মগজ থেকে মুছবেন কিভাবে?
ইসলাম ধর্মের বিধান যারা পড়েন এবং তিনি যদি যুক্তিবিদ্যার পণ্ডিতও হন, তাদের মনে এই প্রশ্ন কোনদিন উঠবে না। কেননা তিনি তার উত্তর জানেন, যা কোরআন-হাদিসের পাতায় রয়েছে। কিন্তু অজ্ঞদের কেউ যদি প্রশ্ন তুলেন, তাদের ধমক দিয়ে হয়ত মুখ বন্ধ করা যাবে কিন্তু এই মতের মানুষের উদ্ভব ঠেকানো যাবে না! এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে ইমাম আবু হানিফা ও তার ছাত্ররা ছিল বেজায় পারঙ্গম। তাই ঈমাম আবু হানিফার (রহ) দর্শন, প্রয়োগের নিয়ম-নীতি ও প্রতি-যুক্তি খণ্ডন করার পদ্ধতি একাজে বেশী ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁরা এর চাইতেও জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্নকারীর উত্থাপিত প্রশ্নকে ভোতা করেছেন।
খলিফা হারুনূর রশিদের সন্তান, আল মামুনের আমলে প্রচুর গ্রীক সাহিত্য, দর্শন আরবিতে ভাষান্তরিত হয়। তখন একদল ইসলাম প্রিয় মানুষের কাছে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার এক ভিন্ন কর্মপদ্ধতি সামনে হাজির হয়। এই বিষয়ের সাথে মুসলমানেরা অতীতে পরিচিত ছিল না কিন্তু গ্রীক দার্শনিকেরা এই বিদ্যার কারণে প্রসিদ্ধ ছিল। মুসলমান হওয়া স্বত্বেও, যারাই এই বিদ্যার প্রতি আগ্রহী হয়েছে, ইসলামী সমাজ তাদের সবাইকে তুলো ধুনা করেছে। ইবনে সিনা, জাবির ইবনে হাইয়ান, ইমাম গাজ্জালী সহ শত শত জগত শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যাবে; যারা গ্রীক দর্শন পড়ে, দর্শন শাস্ত্রের নতুন নিয়মনীতি আত্মস্থ করে, উল্টো গ্রীক দর্শনের ভুল তুলে ধরছে। একইভাবে তারা স্বধর্মের মানুষ দ্বারাও অব্যাহত আক্রমণের শিকার হয়েছেন! বহু আলেম মুখের ফুয়ের জোড়ে তাদেরকে ইসলাম থেকেই বের করে দিয়েছেন, তাদের লিখার কোন অংশ না পড়েই! এর ফল মুসলমানদের পক্ষে যায় নি।
পরিণতিতে হয়েছে কি? আলেমদের লিখিত বইগুলো মাদ্রাসায় স্থান করে নিয়েছে এবং গাজ্জালী, সিনা, খলদুনের বইগুলো দুনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরী দখল করে ছাত্রদের পাঠ্যসূচিতে স্থান করে নিয়েছে। সিনার ‘আল কানুন ফিত তিব্ব’ পাঁচশত বছর ইউরোপের পাঠ্য সূচিতে ছিল কিন্তু মুসলমানদের কাছে ছিল আকিদা বিনষ্টকারী গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। বামপন্থার নেতিবাচকতা ও ইসলাম
একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ দিয়ে শেষ করব, পাশাপাশি ইবনে খলদুনের আল মুকাদ্দিমা ও কার্ল মার্কসের ডাস ক্যাপিটাল পড়া যেতে পারে। দেখতে পাব, খলদুন সমাজ-রাষ্ট্রের ব্যবহারিক দুর্বলতা, অসঙ্গতি তুলে ধরে যেখানে ডাক্তারের মত পরামর্শ দিয়েছে। সেখানে কার্ল মার্কস দাঁড়িয়ে জগতের সকল মানুষকে সমান করার নতুন দর্শনের যাত্রা শুরু করেছেন। কিন্তু আমাদেরকে মুকাদ্দিমা পড়তে দেওয়া হয়নি এই বলে যে, ইবনে খলদুনের চিন্তা-বিশ্বাসে ত্রুটি ছিল। তাইতো মাঠ খালি পেয়ে কার্ল মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটাল কাঁধে বসে মগজ ছিঁড়ে খাচ্ছে। বর্তমানের বামপন্থি প্রজন্ম তারই ফল। এখন সময় ফিরে এসেছে, আলেমদের শুধুমাত্র কোরআন-হাদিস পড়লেই চলবে না। তাদেরকে, কার্ল মার্ক্স, ম্যাকিয়াভ্যালি, লেনিনের লিখা পড়তে হবে, তাদের চিন্তার উৎস জানার জন্য। সাথে সকল ইসলামী দার্শনিকদের লিখিত বইও আত্মস্থ করতে হবে, তথ্য উপাত্তকে প্রয়োগ করার পদ্ধতি জানার জন্য। তাহলে বামপন্থি সহ কোন পন্থিদের কোন জিজ্ঞাসাকেই আর প্রশ্ন বলে মনে হবেনা। ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য এর চেয়ে সুন্দর কর্মপন্থা দ্বিতীয়টি নেই।


Discussion about this post