এখন যেভাবে পথে ঘাটে সাংবাদিক আর রিপোর্টার পাওয়া যায়; আজকের চেয়ে চল্লিশ বছর আগেও এই পেশা অর্জন করতে হলে মেধাবী তো বটেই, যথেষ্ট পরিশ্রমী ও কৌশলী হওয়া লাগত। সে কারণে ঐ জমানার একজন সাংবাদিক, রিপোর্টার কিংবা পত্রিকা প্রকাশকের অনেক সম্মান ও মর্যাদা ছিল অনেক অনেক উপরে!
সে সময়ে এই পেশায় আসতে গেলে তাকে অবশ্যই শর্টহ্যান্ড লিখনি আয়ত্ব করতে হত। বিষয়টা সংক্ষিপ্ত ভাবে পরিষ্কার করি,
“একজন বক্তা মঞ্চে দাঁড়িয়ে যত দ্রুত বক্তব্য শেষ করতে পারেন বিপরীতে একজন লেখক তা তত দ্রুত নোট করতে পারে না। পুরো বক্তব্যকে ছোট নোটে ধরে রাখার পদ্ধতিকেই বলা হয় শর্টহ্যান্ড”।
যারা শর্টহ্যাণ্ডকে পেশা হিসেবে নেয়, তাদের বলা হয়, স্টেনোগ্রাফার (Stenographer).
সরকারী বেসরকারি বড় বড় অফিসে অনেক স্টেনোগ্রাফার পদ ছিল। সে কারণে শর্টহ্যাণ্ড কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে শিখানো হত। সরকারী কারণিক পদের জন্যে এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিল! ফলে, এই পোষ্টে বহু চাকরির সুবিধা ছিল কিন্তু নিরস, বিস্বাদ এ কাজটি আয়ত্ব করা সহজ ছিল না। ঠাণ্ডা মাথার ধৈর্যশীল শিক্ষার্থীরাই এখানে ভাল করত। কেন তবে এই পদ গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
স্টেনোগ্রাফার (Stenographer) পদে শর্টহ্যান্ড:
সরকারি অফিস, আদালত এবং বড় বড় কর্পোরেশন গুলোতে স্টেনোগ্রাফাররা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বক্তৃতা, আলোচনা বা নির্দেশ দ্রুত লিপিবদ্ধ করতেন।
রিপোর্টিং এবং সাংবাদিকতায় শর্টহ্যান্ড:
সাংবাদিকরা সরাসরি ঘটনাস্থলে বা প্রেস কনফারেন্সে বক্তাদের কথা দ্রুত লিখে রাখার জন্য শর্টহ্যান্ড ব্যবহার করতেন।
আদালতের রেকর্ড ধারণে শর্টহ্যান্ড:
আদালতে বিচারক, আইনজীবী এবং সাক্ষীদের বক্তব্য নির্ভুলভাবে দ্রুত লিপিবদ্ধ করার জন্য কোর্ট রিপোর্টাররা শর্টহ্যান্ড ব্যবহার করতেন।
ব্যক্তিগত সহকারী (Personal Assistant) পদে শর্টহ্যান্ড:
বড় কর্মকর্তা বা পরিচালকদের ব্যক্তিগত সহকারীরা তাদের মিটিংয়ের নোট, চিঠি বা অন্য জরুরি বার্তা লেখার জন্য শর্টহ্যান্ড ব্যবহার করতেন।
শিক্ষার্থী এবং গবেষকের কাজে শর্টহ্যান্ড:
দ্রুত নোট নেওয়ার জন্য শর্টহ্যান্ড শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বা গবেষণার সময় এটি সংক্ষিপ্ত সময়ে দ্রুত কাজে লাগত।
আমার প্রিয় নাজির হাট কলেজ শর্টহ্যাণ্ড শিখার জন্যে বিখ্যাত ছিল। ফলে দূর দূরান্তের মফস্বলের ছাত্ররা এই কলেজে পড়তে আসত। আজকে সাংবাদিকতা ও রিপোর্টিং আগের মত অত কঠিন না হওয়ায়, একটি ক্যামেরাকে পূঁজি করেই প্রতিটি জনপদে সাংবাদিক গড়ে উঠেছে। সাংবাদিকতার মান কমেছে, কাজ কমেছে!
মেট্রিক পরীক্ষায় ১০ মার্কের প্রশ্ন আসত, নিজের এলাকার সমস্যা বর্ণনা পূর্বক, পত্রিকায় প্রকাশের জন্যে একটি সংবাদ লিখ। আগে সাংবাদিকদের পিছনে মানুষ ছুটত, যাতে তার এলাকার খবরটি পত্রিকায় দেয়। এখন সাংবাদিকেরা মানুষের পিছনে দৌড়ায়। কিছু না পেলে অন্যের ঘরের খবর চাউর করে, নিজেদের কাটতি বাড়ায়।
এখন জমানা সহজ হয়েছে কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে মানুষের আচরণ রূঢ় হয়েছে। তাই বিদ্যা-শিক্ষাকে অত সহজ করা উচিত নয়, যাতে সেটা পাড়ি দেওয়া শিক্ষার্থীর জন্যে মামুলী বিষয় না হয়ে যায়।
ছবিতে শট্যহ্যান্ডের একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, অনেকের কাছে ওটা হাবিজাবি অঙ্কন কিন্তু এ বিষয়ে একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির কাছে ওটা একটি বিরাট বক্তৃতা।