দশকের কাছাকাছি হতে চলল ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ডে কাজ করছি। পৃথিবীর বহু আকর্ষণীয়, চিত্তাকর্ষক, দৃষ্টিনন্দন প্রজেক্টের জন্ম হয়েছে, আরব আমিরাতে। আমেরিকা, ইউরোপ আর অস্ট্রেলিয়ার বহু প্রকৌশলীরা কাজ করেন এখানে। তাছাড়া প্রায় পর্যটকের লক্ষ্য থাকে এদেশের বহু মাত্রিক ভবন গুলো। তাই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে দেখেছি, এদেশে কম বেশী সিভিল, ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা তখনও ছিল এখনও আছে। মূলত উপরের এই তিনটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফিল্ড হল, প্রকৌশল ক্ষেত্রের মূল চালিকা শক্তি।
জমানা ডিজিটালাইজ হবার পরে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর চাহিদা বেড়েছে প্রচুর। সেই হিসেবে এই বিষয়টি সকল ছাত্রদের কাছে স্বপ্নের বস্তু এবং বর্তমানে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিপার্টমেন্ট। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে আরো কিছু বিষয় যোগ হয়েছে, যেমন ETE, WRE, PMP, MIE, BME, MSE ইত্যাদি। সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বিষয়গুলোর চাকুরী আছে, কখনও অনেক বেতন তোলা যায়। তবে প্রয়োজন ও ফিল্ড ভেদে এক দেশে এক ধরনের চাহিদা। সে জন্য ছাত্রদের বিচার বিশ্লেষণ করে এগুতে হয়।
আরব দেশের তিন হাজার জন শক্তি সম্পন্ন একটি ইলেক্ট্রো-মেকানিক্যাল কোম্পানির হিসাব টানলে ব্যাপারটা বুঝতে সহজ হবে।
যে কোম্পানিতে মেকানিক্যাল, ইলেক্ট্রিক্যাল মিলিয়ে বিশ জন ইঞ্জিনিয়ার। উপরোক্ত বিষয়ের ফোরম্যান ত্রিশ জন। দক্ষ ইলেক্ট্রিশিয়ান পঞ্চাশ, পাইপ ফিটার পঞ্চাশ, মেকানিক, ওয়েল্ডার, টেকনিশিয়ান প্লাম্বার সহ বহু কাজে আড়াই শয়ের মত মানুষ লাগতে পারে। একাউন্ট সেকশনে পাঁচ জন। জি, এম একজন। দরকার হলে ডাইরেক্টর একজন। পাবলিক রিলেশনে দশ জন। সর্বমোট তিনশত কর্মক্ষম মানুষের বিপরীতে দুই হাজার সাত শত অদক্ষ শ্রমিক কাজ করে থাকবে। এত মানুষের বিপরীতে আই,টি ডিপার্টমেন্টে মাত্র একজন এক্সপার্ট এর দরকার হয়। অর্থাৎ যেখানে তিনি হাজার মানুষের ক্ষুন্নি বৃত্তির চাহিদা মিটছে সেখানে আইটি থেকে মাত্র একজন মানুষের অন্নের সংস্থান হচ্ছে! আমাদের দেশের বড় বড় ফ্যাক্টরিগুলোতে উকি দিলেই এই কথার সারমর্ম বুঝতে পারব।
না আমি কম্পিউটার সাইন্সকে হেয় প্রতিপন্ন করছিনা। সহজ সাবলীল কথাটাকে সাদামাটা ভাবে বুঝার জন্য উল্লেখ করছি। আমাদের দেশের সরকারী-বেসরকারি সকল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে EEE ও CSE দুটো বিষয় Common আছেই। আবার CSE এমন একটি বিষয়, একজন সৃষ্টিশীল ছাত্র, এই বিষয় থেকে বহুমুখী রাস্তা বের করতে পারে। তাই তরুণেরা এই বিষয়ে বেশী আগ্রহী। আমাদের দেশে প্রতিবছর এই দুই বিষয়েই বেশী সংখ্যক ছাত্র বের হচ্ছে। কোন একজন গুগলে সুযোগ পেয়ে যাবার অর্থ এই নয় যে, দলে দলে তরুণদের স্থান হচ্ছে সেখানে। এটা উদাহরণ হতে পারেনা বরং ব্যতিক্রম মাত্র। দেশের সকল ছাত্র সৃষ্টিশীল নয় কিন্তু আবেগ তাড়িত। সৃষ্টিশীল ছাত্র অখ্যাত বিষয়ে পড়েও বিখ্যাত হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর হয়ে অনেক Celebrity তথা যশস্বী ব্যক্তিরা কিছু নিদ্দিষ্ঠ বিষয়ের পক্ষে কথা বলে। তাদের প্রচারণায় ছাত্ররা বুঝে,এসব বিষয়ে পড়লে চাকুরীর সুযোগ বেশী। আর বাকী বিষয় গুলোতে কপালে হাত মারতে হবে। কথাগুলো মন্দ না কিন্তু ছাত্ররা দিক-হারা হয়। বাংলাদেশে বসে দুনিয়ার চাহিদা তারা বুঝতে পারে না। সবাইকে দেখতে হবে, পাঁচ বছর পরে কোন বিষয়টি সেরা হবে, দশ বছর পরে কোনটি। সে হিসেবে পদক্ষেপ নেওয়া।
জীবনের মোড় ঘুরবে একটি সিদ্ধান্তে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলে তো অনেক টাকার ব্যাপার-স্যাপার আছে। তাই প্রতিটি ছাত্রের জন্য যে বিষয়টা জানা জরুরী, সেটা হল কোন ইঞ্জিনিয়ারিং কোন দেশে সেরা এবং কেন? এ তথ্য আগে জেনে নেওয়া। এ জন্য করনীয় ঠিক করতে একটি কাজ করা যায়। প্রতিটি সাবজেক্ট নিয়ে আলাদা করে গুগল ও ইউটিউবে সার্চ দেওয়া যায়। সেখানে প্রশ্ন রাখা যায় কোন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ফিল্ডের ডিমান্ড কেমন? নিচের মত করে সার্চ করতে পারি।
Most In-Demand Engineering field
top ten engineering fields
The best engineering fields
হয়ত দেখা যাবে, আমাদের দেশের যে সব বিষয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয় তাদের তালিকা এখানে নেই! হতাশ হয়ে পড়বো? কখনও নয়! এবার আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়গুলো আছে সেগুলো নিয়েই গুগলে সার্চ দেওয়া যায়। মনে সন্তুষ্টি আসার মত উত্তর না পেলে কি আবারো হতাশ হবো? মোটেও না! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর পরিপূর্ণ বৃত্তি দিয়ে শত শত ছাত্র সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সে বিষয়ে তারা জেনে শুনেই কাজটাতে হাত দিয়েছে। ছাত্রদের দায়িত্ব হল পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর তোলা। ডিপার্টমেন্ট আর বিষয় আলোচনার মূল লক্ষ্য নয়। ভাল নম্বর তোলা ছাত্র যে কোন জায়গায় ফিট হয়ে যাবে। জিপিএ দুই-আড়াই তোলার জন্য যাতে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি না হয়। এই ডিগ্রীর কথা বলাও যায় না, আলগিয়েও রাখা যায় না আবার CV তে লিখাও যায়না, চক্ষু লজ্জায় চাকুরীর মুখোমুখিও হওয়া যায় না।
উপরের অনুশীলন টা যথাযথ করতে পারলে, দূরদর্শী বিজ্ঞ ছাত্ররাও বুঝে নিতে পারবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যারয়ে সুযোগ পেলে তো ভিন্ন কথা; যারা প্রাইভেটে পড়তে চায় তাদেরকে গভীর ভাবে ভাবা উচিত। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ার টাইটেল পাওয়া যাবে বটে কিন্তু পিতার পকেট থেকে গচ্ছা যাবে কমপক্ষে দশ লক্ষাধিক টাকার উপরে আর যাবে নিজের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। অবশেষে নিজেকে একটি চাকুরীর আশায় হতাশ হয়ে ঘুরতে হবে রাস্তায়। তাই কি করা উচিত তা এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবার থেকে পরামর্শ তো নিতেই হবে, সাথে সাথে কম্পিউটারের সার্চ আয়নায় চোখ রাখতে হবে, নতুন ভবিষ্যৎ বানাবার কারিকর দের।

Discussion about this post