অনেকের মনে এই প্রশ্ন প্রথম আসে যে, অন্যের লিখা বই পড়ব কেন? ঠিক এই প্রশ্নটি কেউ আমাদের করলে, আমরা কি উত্তর দিব? অনেকের কাছে হয়ত এর সুন্দর সদুত্তর নেই। একজন নি-রস ব্যক্তি হয়ত এসব নিয়ে ভাবে না কিন্তু এই প্রশ্ন সব যুগে বিদ্যমান। পিতৃ প্রদত্ত ধনে যিনি ধনী হন, তিনি কোনদিনই বুঝে না যে, বই পড়ে লাভ কি? আর যারা বই পড়ে তারাও বুঝাতে পারে না যে, বই পড়ার মাঝে মজা কি?
যাক, কথা হচ্ছিল আমরা বই পড়ব কেন? বই পড়তে গেলেই আবার সেটা অন্যের বই! তার সোজা সাপটা উত্তর হচ্ছে, আমরা বই পড়ি অন্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর জন্য। অন্যের দৃষ্টিতে দুনিয়াকে দেখার জন্য।
পৃথিবীর কোন প্রাণীকে শিখতে হয়না, জন্মের সময়েই আল্লাহ তার মগজে তথ্য ঢুকিয়ে দেন। সে তথ্যানুসারে প্রাণীরা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে সে অসুস্থ হলে, তাকে ডাক্তারের কাছে যেতে হয়না, সে নিজেই নিজের ঔষধ চিনে নেয়। মানুষের সৃষ্টি-শৈলী এমন নয়! তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় কারো অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকেই।
বই হল এ কাজের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। যে বই পড়ে সে অন্যদের চেয়ে সর্বদা বেশীই জানে। বই পড়ে, কেউ তথ্যকে কাজে লাগায়, কেউ ঘটনাকে কাজে লাগায়, কেউ বাক্য প্রয়োগের ধরনকে ব্যবহার করে আবার কেউ উপাদানকে কাজে লাগায়। এভাবে একটি বইয়ে বহু উপাদান থাকে, নানা মানুষ নানা উপাদানে আকৃষ্ট হয়। সে জন্য এক বই একজনের কাছে সেরা হলেও অন্যের কাছে হয়ত তা নয়।
বই না পড়লে জ্ঞান সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাই এটাকে অব্যাহত রাখতে হয়। এটাকে অব্যাহত রাখার অন্যতম উপাদান হল নতুন করে আরো বই লেখা, আরো অভিজ্ঞ মানুষের জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করা। সে জন্য নতুন লেখক সৃষ্টি করা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়াও কোন জাতির অন্যতম কাজ।
কেননা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মানুষকে মূর্খ করে তুলে। ইতিহাসে দেখা যায়, অতীতে শিক্ষিত ছিল কিন্তু জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে পরবর্তীতে বহু জাতি মূর্খতায় পর্যবসিত হয়েছে। যে জাতি পড়াকে গুরুত্ব দিয়েছে সে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে।
যুদ্ধে গ্রীক-বাহিনী খলিফা হারুনুর রশীদের হাতে পরাজিত হয়। তাদের ধৃত সৈন্যদের উদ্ধার করার জন্য মুক্তিপণ হিসেবে নগদ অর্থের বিপরীতে গ্রীকের লাইব্রেরীতে আবদ্ধ বইগুলো হারুনুর রশীদকে দিয়ে দিবে বলে চুক্তিবদ্ধ হয়।
পরবর্তীতে সে সব বই অনুবাদের মাধ্যমে পড়ে বাগদাদ সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আবার পড়া ছেড়ে দিয়ে, সেই বাগদাদ জ্ঞানহীন নগরীতেও পরিণত হয়েছিল।
মানব জীবনে পড়াটা কত বড় গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হল পবিত্র আল কোরআন। কোরআন শব্দটি এসেছে ‘কুরা’ থেকে যার অর্থই হল ‘পড়া’। কোরআন শব্দের মূল অর্থই হল অবিরত পড়া, বিরামহীন পড়া, সর্বাধিক পরিমাণ পড়া ইত্যাদি।
আল্লাহর পক্ষ হতে এই পৃথিবীতে মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে কথাটি এসেছে তার উচ্চারণ হচ্ছে ‘ইকরা’। এর অর্থ হল পড়া। স্বয়ং আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করে তার জন্য পড়ার মাধ্যমেই পথের সন্ধান করার রাস্তা বাৎলিয়েছে।
সে জন্য ইসলাম ধর্ম তার অনুসারীদেরকে পড়াটা অপরিহার্য কর্তব্য বলে ঘোষণা দিয়েছে। সে জন্য মানুষ নিজেকে চিনতে হলে, নিজের সম্পর্কে জানতে হলে, সর্বপ্রথম যেটি দরকার, সেটাই হল পড়া।
প্রতিটি বই একজন জ্ঞানী সঙ্গীর মত কাজ করে। যে ব্যক্তি একশত বই পড়ল, সে একশত জন জ্ঞানীর সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ করল, একশ জন বিজ্ঞের চোখে দুনিয়াকে দেখল।
এই একশ জনের চিন্তার উপর ভর করে সমসাময়িক বিষয়াদি নিয়ে সে যদি একটি বই লিখে, দেখা যাবে সেটা বাজারে সফল হয়েছে; সর্বোচ্চ বিক্রিত সংখ্যার বইয়ের উপাধিও পেয়ে যেতে পারে।
হয়ত কেউ ভাববে, লিখার জন্য তো যোগ্যতা দরকার; ভাষা শৈলীকে বিন্যস্ত করা দরকার। মূলত শুরুতে এটা একটা বিশাল বিষয় হলেও, যার কাছে একশত বইয়ের জ্ঞান থাকবে তার পক্ষে এটাও খুবই সোজা হয়ে যেতে পারে।

Discussion about this post