আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে মিম্বরের উপর উপবিষ্ট অবস্থায় পূর্ব দিকে ইঙ্গিত করে বলতে শুনেছি, সাবধান! ফিতনা-ফাসাদের উদ্ভব ঐদিক থেকেই হবে এবং শয়তানের শিং উদিত হবে।
বোখারী হাদিস নং ৩৫১১
দেখা যায়, ইসলামের ইতিহাসে, এ যাবত যত ফিতনা-ফ্যাসাদ, মতবাদ, বিদায়াতের সৃষ্টি হয়েছে তার সবই আরবের পূর্বদিকেই উদিত হয়েছে। এতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বানী সত্যে পরিণত হয়েছে। আরবের পূর্বদিক সৃষ্ট এসব মতবাদ ও বিদায়াতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছুর নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে উল্লেখ করা হল; আগ্রহী পাঠকেরা দেখে নিতে পারেন।
১. খারিজী (ইসলামী মৌলিক নীতিতে আপত্তির কারণে নিজেরাই নিজেদের আলাদা করে নিয়েছে। আরবিতে খারিজ অর্থ – বের হয়ে যাওয়া)
২. শিয়া (আবদুল্লাহ বিন সাবাহ’র মাধ্যমে সৃষ্ট ফিতনা। এরা খেলাফত অথবা গণতান্ত্রিক পন্থায় ইমাম নির্বাচনের ঘোর বিরোধী। তারা দাবী করে একমাত্র আলী-ফাতিমার রাঃ বংশ থেকেই ইমাম আসতে থাকবে, অন্য কেউ ইমাম হতে পারবে না। ইমাম দ্বারা শাসন কে তারা ইমামত বলে থাকে, তারা বিশ্বাস করে ইমামদের কোন গুনাহ নাই)
৩. মুতাজিলা (ইসলামের যে সব বিষয়কে যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে, যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হবে, কেবল সেগুলোই পালন করা হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে এখানেই যুক্তিই প্রধান)
৪. ক্বাদারিয়াহ (তকদিরের ব্যাখ্যা নিয়ে নিজেরা নিজেদের মত করে ভিন্ন মত পোষণ করে)
৫. জাবারিয়াহ (মানুষের কোন ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা নাই, মানুষ যত সুকর্ম-অকর্ম করে, সব আল্লাহর মর্জিতেই হয়)
৬. জাহমিয়াহ (জাহম ইবনে সাফওয়ান – ইমান হল অন্তরের ব্যাপার। জান্নাত-জাহান্নাম কোনটাই চিরস্থায়ী নয়)
৭. কাদিরীয়া (আবদুল কাদের জিলানীর রঃ নামে চালিয়ে দেওয়া, সুফিদের একটি মতবাদের নাম)
৮. চিশতিয়া (খাজা মইন উদ্দীন চিশতীর রঃ নামে চালিয়ে দেওয়া একটি সুফিবাদের নাম)
৮. নাকশেবন্দিয়া (মুহাম্মাদ ইবনে বাহাউদ্দীন আল বুখারী ১৩১৭-১৩৭১ খৃঃ কর্তৃক আরেকটি সুফিবাদের নাম )
৯. মুজাদ্দেদীয়া (মুজাদ্দেদে আলফে সানীর রঃ নামে চালিয়ে দেওয়া একটি সুফিবাদের নাম)
১০. বাহাই (ইরানের বাহাউল্লাহ ১৮১৭-১৮৯২ খৃঃ নিজেকে সকল ধর্মের অবতার ঘোষণা করে নতুন ধর্মমত চালু করেন। তার এবাদত খানায় সকল ধর্মের মানুষ নিজের ইচ্ছামত ধর্ম পালন করতে পারে)
১১. কাদিয়ানী (ভারতের কাদিয়ানের গোলাম আহমদ ১৮৩৫ নিজেকে নবী দাবী করে নতুন ধর্মমতের জন্ম দেয়) কাদিয়ানী ফেরকার জন্ম দেন)
১২. আগাখান (ইরানের আগাখান নিজেকে অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিভূ ঘোষণা দিয়ে নতুন ফেরকার সৃষ্টি করেন, এখানে ইমাম যত বড় পাপীই হোক না কেন, তার কোন গুনাহ ধরা হবেনা বরং তিনি অনুসারীদের গুনাহ ক্ষমা করার অধিকার রাখেন)
১৩. আজমেরী রেজাখান (করবে গিয়ে মান্নত করে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নতুন মতবাদ সৃষ্টি করেন; তিনিই আজমিরে কবর পূজার মূল প্রবর্তক)
১৪. ইলিয়াসি তবলিগ (এটি একটি মতবাদ বা দর্শন। ঘর-সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য ত্যাগ করে, স্ত্রী-সন্তানদের স্বীয় অবস্থায় রেখে দিয়ে, নিজেকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে, দুনিয়াদারীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে কিছুদিনের জন্য আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে পড়া এই দর্শনের মূল লক্ষ্য। সরাসরি কোরআন-হাদিসের উৎস থেকে জ্ঞান আহরণ না করে মরহুম ইলিয়াস রহঃ লিখিত কিতাব থেকেই জ্ঞান আহরণ করা এই দর্শনের মূল ভিত্তি)
১৫. বেরেলভী দর্শন (এরা নিজেদের কে রাসুলের আদর্শে অনুপ্রাণিত প্রকৃত সুন্নি দাবী করে। অন্যদের কে পথভ্রষ্ট ভাবে। বিভিন্ন আরবি সাহিত্য, পুথি থেকে সংগৃহীত অনুপ্রেরণা মূলক কবিতা, গজলকে সুর করে পড়ে রাসুলের শানে তুলে ধরতে পারাকে এবাদতের মত উত্তম কাজ মনে করেে। তাদের বিশ্বাস রাষ্ট্রপতির নিকট তদবিরের ফাইল পৌছতে যেভাবে অনেক কর্মকর্তার হাত ঘুরে যেতে হয়। সেভাবে আল্লাহ-রাসুলের নিকট নিজের দাবী, চাওয়া-পাওয়া খবর পৌছাতে পীর, পীরের পীর, বড় পীর হয়ে সেখানে পৌছতে হয়। সে কারণে পীরের প্রতি অধিক আস্থাশীলতা, মাজারে ওরস করার মত কাজ গুলোকে অধিকতর কল্যাণজনক কাজ মনে করে)
এভাবে সাহরোওয়ার্দিয়াহ, তৈয়বীয়া, পীর-মুরিদের সিল সিলা সহ অগণিত অসংখ্য দর্শন-মতবাদ, ফেতনা-ফ্যাসাদের জন্ম আরবের পূর্ব দিকেই সৃষ্টি হয়েছে। এক পীরের মৃত্যুতে ছেলে-সন্তান-জামাতা সহ আরো বহু পীরের সৃষ্ট হতে হতে বিষাক্ত শিংয়ের আকার আর সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে।
রাসুল (সাঃ) শয়তানের শিং বলতে বুঝিয়েছেন যে, আত্মরক্ষার লক্ষ্য নিয়ে শিং নিজ দেহেই গজায়। কখনও শিং নিজের জন্য মুসিবতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে হিসেবে ইসলামকে সুচারুরূপে, সঠিকভাবে পালন করার জন্য, নিজেদের সৃষ্ট দর্শনকে, ইসলাম ও দ্বীনের অঙ্গ বানিয়ে নেওয়াই হল শিং গজানো। দৃশ্যত সুফিবাদ, তাবলীগ আর বেরেলভী দর্শনের জন্ম হয়েছে ইসলামকে তরতাজা ও সুঠাম রাখার জন্যই। এখনও মানুষ তাদের প্রকৃত ইসলামের সেবাদার ভাবে কিন্তু সেটা ইসলামের প্রকৃত রূপ নয়।
হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন করেছেন, তীতুমীর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন, শাহ ওয়ালীউল্লাহর লাখে লাখে অনুসারী সারা ভারতে ছড়িয়েছে। এগুলোকে কেউ মতবাদ, ফেরকা বা দর্শন বলেনি। কেননা তাঁরা মানুষদেরকে সরাসরি কোরআন-হাদিসের দিকেই আহবান করেছেন। নিজে মত করে মতবাদ বানিয়ে সেটার দিকে মানুষকে আহবান করেন নি। তফাত টা এখানেই।

Discussion about this post