জংলী বরই, লড়াই করে বাঁচে আর মৃত দেহের গোসলে কাজ দেয়

জংলী বরই, ইংরেজিতে Jujube, বোটানিক্যাল নাম Zizyphus jujuba, বাংলাদেশের বনে বাদারে মানুষের সাথে লড়াই করেই বড় হয়। এই গাছটি একেবারেই অবহেলিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। চিকন শাখার জন্ম হয়, দুদিকে পাতার সাড়ি, আর সে পাতার নিচে জন্ম নেয় ক্ষুদ্র প্রকৃতির বরই। অনেক সময় পাতার চেয়ে তার কাটার দূরত্ব আরো লম্বা হতে দেখা যায়। এ ধরনের কাটা দেখলে মনে হবে মানুষের সাথে তার যেন চরম বৈরিতা রয়েছে। এটার পাতা ঠিক আমাদের দেশের অন্যান্য কুল/বরই পাতার মতই। যেহেতু পরিবেশের সাথে লড়াই করে বড় হয়, সে কারণে দেশী বরইয়ের চেয়ে, জংলী বড়ইয়ের পাতা, ফলে  রয়েছে তেজ সৃষ্টিকারী গুণাবলী।
 
এসব ক্ষুদ্র বরই বা কুল শুরুতে সবুজ থাকলেও পাকার সময়, হলদে, কাল ও লালচে বর্ণের হয়ে যায়। দেখতে অবিকল মুক্তোর দানার মত। আকারেও প্রায় মুক্তোর মত। স্বাদে মিষ্টি কিন্তু দেহে গোশত কম। পুরোটাই যেন বিচি। তাই অনেক কাঁটার গুঁতো খেয়ে, একশত কুল ছিনিয়ে নিয়ে, সর্বসাকুল্যে দেখা যাবে দুইশত গ্রাম বরই তোলা হয়েছে। এ ধরনের অকাজে মানুষের সময় দেবার আগ্রহ কম, তাই মানুষের অবজ্ঞার মধ্যে বেড়ে উঠে। আল্লাহ তার সৃষ্টি নৈপুণ্যের মাধ্যমে সকল সৃষ্টিকে উত্তম কৌশলে বাঁচিয়ে রাখেন। বুলবুলি, টুনটুনি, ক্ষুদে টিয়ে সহ নানাবিধ ফল ও মধু নির্ভর প্রাণী গুলোকে বাঁচিয়ে রাখে এই বরই গাছ। এরা এসব খেয়ে নানা জায়গায় উড়ে গিয়ে পায়খানা করে আবার গাছের বংশ বিস্তার করে। উচ্চতায় ছয়-সাত ফুটের মত হয়। ইটের দেওয়ালের কোল, পিলারের গোঁড়া, বিদ্যুতের খাম্বা, ব্রিজের পাটাতন ও বাংলাদেশের সাধারণ জঙ্গল হল তার প্রিয় বাসস্থান।
 
মানুষের কাছে অবহেলিত হলেও এই গাছটি ইউনানি ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বহু বছর ধরেই ব্যবহার হয়ে আসছে। মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে এটার আবাদ বেশী তারা এটাকে কাজেও লাগায় ভাল। এই গাছটি সাইক্লোপপটিড ক্ষারকোষ সৃষ্টি করে ফলে প্রকৃতিগত ভাবেই এটা ক্ষার প্রকৃতির ও ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধক। ফলে মাউথ ওয়াশ ও দাঁতের মাজন হিসেবে দারুণ উপকারী। পুরো মুখগহ্বরকে তরতাজা ও সতেজ করে তুলে। গলা ব্যথা, আমাশয়, জরায়ুর প্রদাহের জন্য পরিচিত ভেষজ। এটার নির্যাস দিয়ে রক্ত পরিষ্কার ও রক্ত চাপ কমানোর ঔষধ তৈরি করে ইউনানি চিকিৎসকেরা। প্রাচীন কালে বসন্ত ও গুটি বসন্ত দূর করতে বরই গাছের পাতার উপর মানুষকে শুইয়ে রাখা হত। ইসলামী ধর্মীয় মতে, মৃত দেহ গোসল করাতে, বরই পাতা সিদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয়। দেড় হাজার বছর ধরে চলে আসা এই সংস্কৃতির প্রভাব আজ সারা বিশ্বময়। বরই পাতার ক্ষার গুনের কারণে, মৃত দেহে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ করতে একটু সময় নেয়।