চন্দনকে ইংরেজিতে SANDALWOOD বলে। দু’ধরণের চন্দন রয়েছে। একটি ‘সাদা চন্দন’ অন্যটি ‘লাল চন্দন’ তাকে আবার ‘রক্ত চন্দন’ ও বলে। শুধুমাত্র চন্দন বলা হলে, তাহলে সাদা চন্দনকেই বুঝিয়ে থাকে। সাদা ও লাল চন্দন দুটিই আলাদা প্রজাতির গাছ।
বৈশিষ্ট্য-গত ভাবে একটির সাথে অন্যটির মিল নেই। তবে দুটোই মহামূল্যবান গাছ হিসেবে বিবেচিত। ভারতীয় উপমহাদেশে চন্দনের ব্যবহার বহুবিধ। চন্দনের ঘ্রাণ উপাদেয়, এর ঘ্রাণেও রয়েছে বহুবিধ উপকারিতা। এর ঘ্রাণ ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী। সকল শ্রেণী বয়সের মানুষের নিকট এই ঘ্রাণ পছন্দনীয়। চন্দনের তাজা ঘ্রাণ কিংবা ধোঁয়া শ্বাসনালীর প্রদাহ দূর করে। বাচ্চাদের বদ হজম দূর এবং হজম শক্তি বৃদ্ধিতে এর তুলনা নাই। পেটের গ্যাস, কলিজার প্রদাহে বড়ই উপকারী।
চন্দনের উপকারিতা নিয়ে স্বয়ং রাসুল (সা) বলেছেন,
“তোমরা ভারতীয় চন্দন কাঠ ব্যবহার করবে, কেননা তাতে সাতটি আরোগ্য রয়েছে। শ্বাসনালীর ব্যথার জন্য এর (ধোঁয়া) নাক দিয়ে টেনে নেয়া যায়, পাঁজরের ব্যথা বা পক্ষাঘাত রোগ দূর করার জন্যও তা ব্যবহার করা যায়” বুখারী-৫৬৯২
সবচেয়ে বড় কথা চামড়ার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে চন্দনের উপরে কোন ভেষজ উদ্ভিদ আজো আবিষ্কৃত হয়নি। খাজুলি-চুলকানি, চামড়ার কালো ও লালচে দাগ দূর করা, স্ক্রিন ক্যান্সার, চামড়ার এলার্জিতে সারা দুনিয়া-ব্যাপী সমাদৃত এই চন্দন। এর কাষ্ঠ খণ্ডকে পাথরের উপরে ঘষলে মিহি কাই বের হয়। সেটার বর্ণ খুবই সুন্দর, মানুষ চন্দন বর্ণের চামড়া খুবই পছন্দ করে।
তাইতো সুশ্রী রমণীরা তাদের গায়ের রং চন্দনের মত করার জন্য উদগ্রীব থাকে এবং মুখমণ্ডলে চন্দন গুড়ো ব্যবহার করত। চন্দন কাঠে তৈল থাকে, এর কাঠ ঘষা কাই চামড়াতে ঘষলে চামড়ার বর্ণ মিহি ও চিকচিক করে। সকল প্রকার চর্মরোগের এই একটিই পাউডার। আগের যুগে শাহী দরবারের মহিলারা চন্দনকে রূপ সজ্জার জন্য ব্যবহার করত।
চন্দনের এই সুনামের জন্য বর্তমান সময়ের প্রসাধনী কোম্পানী গুলো ফেস ক্রিমের মধ্যে চন্দনের উপদান ঢুকিয়ে সেটাকে মুখমণ্ডলে মাখার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফেস পাউডারের বর্ণ ঘ্রাণ অবিকল চন্দনের মতই করা হয়েছে। মূলত কোন ক্যামিকেলের ভিতরেই ভেষজ জিনিষের আসল চরিত্র-উপাদান সজীব থাকেনা। ক্রেতারা ভেবে থাকেন আসল গুনাগুণ বুঝি ক্রিমের ভিতরেই রয়েছে। চন্দনের যথাযথ কার্যকারিতা প্রত্যাশা করলে সরাসরি চন্দন কাঠ থেকেই তা সংগ্রহ করা উচিত।
চন্দন ঔষধ হিসেবে খাওয়া হয়। পেটের গ্যাস, বদহজম, অন্ত্রের দুর্বলতা দূর করতে চন্দনের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। চন্দনের লাকড়িই খাওয়া হয়! যেহেতু মানুষ লাকড়ি খেতে পারেনা। তাই পাথরে পিষে পাউডার বানিয়ে বড়ি আকারে খাওয়া লাগে। এটা একটা কঠিন কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমার দাদীর সেই ঔষধে চন্দনের ব্যবহার লক্ষণীয়। কিছু মহিলা ছিল যাদের অহরহ কাজই ছিল এসব কাঠকে পিষে মিহি বানানো। এখানে বড়ির বিজ্ঞাপন দেওয়া উদ্দেশ্য নয়। যে সব মহিলারা এসব পিষতে গিয়ে নিজের হাতকে একটি বাটিতে ধৌত করতেন। সে পানি গুলো পান করার জন্য অনেকে আবদার করত। অগ্রিম বলে যেত যাতে করে, পরবর্তী বারে তাকে সুযোগ দেওয়া হয়।
কৌতূহল বশত এসব মহিলাদের প্রশ্ন করতাম এতে কি ফায়দা? তারা বলত বাবারে পেট নিয়ে কষ্ট আছি, তাই এই পানি পান করি, ভাল লাগে, কিছুদিন সুস্থ থাকি। তখনও গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট তৈরি হয়নি, মানুষ সোডা খেয়ে কষ্ট নিবারণ করত। তার চেয়ে চন্দনের পানি ছিল অনেক যুতসই। এই পানির মাধ্যমে উপকার পেত বলেই অনেকে এমনটি করত। যেখানে স্বয়ং রাসুল (সা) বলেছেন, “চন্দনে সাত ধরণের রোগের আরোগ্য রয়েছে”
ভারতীয় পুরাণে চন্দনকে ধর্মীয় সম্মান দেওয়া হয়েছে। শুধু বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেই হিন্দু ধর্মে চন্দনের বহুবিধ ব্যবহার দেখা যায়। হিন্দু ধনী ব্যক্তিরা মারা গেলে পরে চন্দন জালিয়ে লাশ দাহ করার ঐতিহ্য বহুকাল ধরে চলে আসছে। মহা মূল্যবান এই চন্দন কাঠের খাটিয়া বানিয়ে ঘুমানোর জন্য বহু বিশ্বনেতাদের মনে খায়েশ জন্মে কিন্তু বেশীর ভাগকেই হতাশ হতে হয়েছে। কেননা একটু ঘ্রাণ নেবার জন্যও চন্দন যেখানে দুঃপ্রাপ্য, সেখানে খাটিয়া বানানোর জন্য তো আরো দুষ্কর হতে বাধ্য।





Discussion about this post