একবার মুসিবতে পড়ে অধ্যাপক আবু সাইয়্যিদ সাহেবের বাইশটি বক্তৃতা এক নাগাড়ে শুনতে বাধ্য হয়েছিলাম! বুঝতে পারছেন ব্যাপার খানা? সাত ঘণ্টার বেশী সময় লেগেছিল! শুরুতে মুসিবত হলেও, শেষ মেষ আমি তার দারুণ ভক্ত হয়ে যাই। সেটা এক ভিন্ন ঘটনা, ভিন্ন কাহিনী, আমার আজকের কথা সেটা নয়। তার কিছু বক্তৃতা নিজ দায়িত্বে পারিবারিক ভাবে বসে, ছেলেকে শুনিয়েছিলাম! কারণ তার কথা, ভাষা প্রয়োগ ও তথ্য উপস্থাপনায় আলাদা একটি মাত্রা কাজ করে। ফলে স্রোতারা কথায় মন দেয়, দর্শকেরা প্রভাবিত হয়।
তিনি পরিবেশ ভেদে বক্তৃতা করতে বেজায় পারঙ্গম। এক্ষেত্রে তার উদাহরণ তিনি নিজেই। জন্মদিন, স্মরণ সভা, গুণীজন সম্বর্ধনা, বিদায় অনুষ্ঠান, স্কুল-কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামে তিনি অনুষ্ঠানের ধরণ, আগত অতিথিদের মান ও রুচি যাচাই করে কথা বলতে ভারী ওস্তাদ! কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পেলে বক্তব্যের আইটেমে প্রেম-প্রীতি নির্ভর কিছু কথা ঢুকিয়ে দেন, এতে তারা চাঙ্গা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা থাকলে, গ্রীক ম্যাথলজির উপমা দিয়ে ভরিয়ে তুলেন।
মিডিয়া জগতের উপস্থিতি পেলে, স্টেজে রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে জীবন দান করতে পারেন, এই মহান ব্যক্তি! পরিবেশ ভেদে এমন যায়গা থেকে তিনি তথ্যকে শান দিতে থাকেন, উপস্থিত দর্শকের হা করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকেনা। তিনিও অধ্যাপক আবু সাইয়্যিদ; তার নিজের জায়গায় তিনি বরেণ্য ব্যক্তি। বাংলা ভাষায় কিভাবে সাবলীল, আকর্ষণীয় বক্তব্য উপস্থাপনা করা যায়, এটা তার থেকে শিখা যাবেই। মিডিয়া জগতের ফোকাস তাকে কেন্দ্র করে ঘিরে থাকে। স্পেশালী প্রথম আলোর কথা বলতেই পারি। এই মিডিয়ায় তিনি যথেষ্ট কভারেজ পান।
উপস্থিত দর্শক-স্রোতাদের মনে আলোচনার বিষয়বস্তু গিলিয়ে দেবার ক্ষেত্রে তিনি বেজায় পটু, ইর্ষণীয় বাকশক্তি তাকে স্রোতামুখী করে। ফলে অনুপ্রেরণা মূলক বক্তব্যের জন্য তিনি সারাদেশে খ্যাতিমান। দেশের উচ্চাসন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী পর্যন্ত তার কথায় প্রভাবিত হয়। ইউটিউবে ইনাস্পায়ার হবার মত বহু বক্তব্য প্রতিনিয়ত আপলোড হয়। আবু সাইয়্যিদ
তিনি প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিমান যাত্রার অনভিজ্ঞতা ও অক্ষরজ্ঞান শূন্যতা নিয়ে তাচ্ছিল্য করেছেন। কটূক্তি, ব্যঙ্গোক্তির কোন ধাপ তিনি বাকি রাখেন নি। উপস্থিত স্রোতারাও প্রতি লাইনে, প্রতি শব্দে, মনের ঝাল মিশিয়ে হেসে নিয়েছেন! মনে হচ্ছিল যেন, এ যেন এক সঙ্গের উৎসব। তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতে তিনি রসালো প্রেমের কথা বক্তব্যের ছলে উপস্থাপন করে থাকে।
ছাত্র-ছাত্রীরা দাদার বয়সী মানুষের মশকারা বলে হাসি দিয়ে উপেক্ষা করে। কিন্তু প্রবাসীদের নিয়ে তার এই ব্যঙ্গোক্তির মধ্য দিয়ে হৃদয়ের অভ্যন্তরের লুকিয়ে থাকা ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, উপহাস সবই এক পাত্রে ঢেলে দিয়েছেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, এ যেন এক ভিন্ন আবু সাইয়্যিদ! তিনি না জাতীয় অধ্যাপক! এটাই কি অশিক্ষিত মানুষদের জন্য তার অনুপ্রেরণা মূলক কাজের ধরন!
আমি ছাব্বিশ বছরের বেশী সময় ধরে প্রবাসে আছি। শুধু মধ্যপ্রাচ্যে না তার বাহিরেও ছিলাম। তাই দীর্ঘ বছর বিমানে আসা যাওয়া করতে হয়েছে। তার সব কথা ভুল সেটা বলব না কিন্তু সবগুলো ঠিক সেটাও মানতে পারছিনা। আমাদের জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ অশিক্ষিত, তিনি তো সেই জনগোষ্ঠীরই জাতিয় অধ্যাপক! এসব দূর করতে তিনি কি ভূমিকা রেখেছেন। তিনি তো হররোজ ইউটিউবে বক্তৃতা আপলোড করেন। আবু সাইয়্যিদ
জানতে ইচ্ছে করে, প্রবাসী যাত্রীদের বিমান আচরণ নিয়ে, সচেতনতা মূলক, দিক নির্দেশনা দিয়ে কোন অনুপ্রেরণা মূলক বক্তব্য কি তিনি রেখেছেন? সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে কি এ ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে ও করণীয় উল্লেখ করে সহযোগিতা করেছেন? ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সহ অগণিত মহান ব্যক্তিরা গ্রামীণ জীবনের এসব ব্যক্তিদের নিয়ে উপাখ্যান রচনা করে সারা দুনিয়াতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। হুমায়ুন আহমেদ এর বেশীর ভাগ নাটকের মূল চরিই তো এসব মানুষ। জীবন ঘনিষ্ঠ এসব নাটক দেখে মানুষ হুমায়ুন ভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের স্থলে আমরা একজন তুখোড় জাতীয় অধ্যাপক থেকে এটা কি বক্তব্য পেলাম!
একজন প্রবাসী হিসেবে অপমানিত বোধ করছি। সাথে সাথে তার মত একজন মানুষ, উপস্থিত দর্শক-স্রোতাদের শুধুমাত্র আনন্দ দেবার জন্যই; রাষ্ট্রের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তির যোগানদাতা প্রবাসীদের নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলেন। এটা মানা যায় না। তার এই বক্তব্যের দ্বারা আমরা বুঝতে পারছি, তার বাহিরের চাকচিক্য ও খ্যাতির চাদরের নীচে লুকিয়ে আছে বক্রতায় আক্রান্ত আরেকটি কদাকার, কুটিল চরিত্র।

Discussion about this post