নিন্দুকেরা বলে, জাতি হিসেবে আমরা নাকি জট পাকানোয় ওস্তাদ! অন্য কথায় বলতে গেলে আমরা এক জট প্রিয় জাতি। জট না থাকলে নাকি কারো কৌতূহল কিংবা দৃষ্টি আকর্ষণ করানো যায় না। আর এজন্যই রাস্তায় ভ্যারাইটিস রকমের ক্যানভাসার-গণ মাত্র কয়েকজন কৌতূহলী পথিককে নিয়ে বিরাট জট পাকিয়ে, তাদের রমরমা ব্যবসার পসার সাজায়। তাবিজ-তুমার, কৃমির ওষুধ বিক্রেতা, দাউদ-একজিমার দোকান, বাত-বেদনা, মালিশের তেল বিক্রির ঝাঁপর, ঘৃত কুমারীর শরবতের টং, চা বিক্রেতার ছাউনি; কোথায় নেই জট! শ্রেণী-পেশার ধরন হিসেবে সকল মানুষই জটের ক্ষেত্রে খুবই আন্তরিক। আর এ ধরনের জটকে বলা হয় ‘জন জট’।
হয়তো ভাবছেন ‘জট’ নিয়েও লিখালিখি হয় নাকি? এটা কেমন কথা? এই যে আপনি ভাবছেন, যার কুল কিনারা পাচ্ছেন না, এই ভাবা-ভাবি নিয়ে সৃষ্টি হবে ভাবনা তথা ‘চিন্তার জট’। এমন হাজারো জটে ভজঘট হওয়া মানুষ চিন্তা করে কুল কিনারা পায় না, কখন কোন জট থেকে মুক্ত হয় আবার নতুন কোন জটে আটকা পড়ে। এ কারণেই জট হয়ে পড়েছে আমাদের চিন্তার খোরাক। জায়গা করে নিয়েছে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। ফলে জট চেনে না অথবা জটের সাথে সাক্ষাত ঘটেনি এমন মানুষ অন্তত দেশে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
দেশে উল্লেখযোগ্য কিছু জটের মধ্যে অতি পরিচিত জট হলো, যান-জট, জন-জট, জল-জট, সেশন জট, চুল-জট, বন্দরে পণ্য জট, বড় দলে প্রার্থী জট এবং সাংবাদিকতায় রহস্যের জট ইত্যাদি। সকল জট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, তা প্রায় আরব্য রজনীর মতো বিশাল একটা উপন্যাস হবে। ফেসবুকিয় পাঠকদের কাছে উপন্যাস এখন যথারীতি একটা ভীতিকর বস্তুর নাম! অধুনা তাদের রচনা আকৃতির লেখা পড়তেও ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। বর্তমান প্রজন্ম ফেসবুকের গুরুদায়িত্ব পালনে অতি ব্যস্ত। তাই সময়ের তাগিদেই তারা প্যারাগ্রাফ স্টাইলের ছোটখাটো লেখা পড়েই দুনিয়া জয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
তরুণেরাই যেহেতু জাতির প্রাণ তাই তাদের রুচি, অভিরুচি এবং মেজাজের তাপমাত্রার কথা বিবেচনা করেই, সকল প্রকার জট খোলা তথা বিস্তারিত লিখা সম্ভব হবে না। তাই সকল জটের মহারাজা তথা ‘যানজট’ সম্পর্কে দু’একটি কথা লিখে পাঠক বিরক্তি রোধে ক্ষান্ত দিব।
যানজটের কারণ: নিন্দুকেরা বলেন, সর্বদা রাস্তা মেরামত, গ্যাস-পানির লাইন ঠিক করা, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইনের সংযোগ স্থাপন, বর্ষায় খানা-খন্দ সৃষ্টি, অনুন্নত রাস্তাঘাট থাকা, নিম্নমানের গাড়ি চলাচল, অননুমোদিত গাড়ি রাস্তায় নামানো, ফুটপাত দখল, রাজনৈতিক সভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, নেতাদের সংবর্ধনা, রাস্তার উপর রেলক্রসিং স্থাপন প্রভৃতি কারণেই যত যানজটের সৃষ্টি!
যান জটের ধারণা: অনেকেই জানে না যানজট বাংলাদেশের শহর-নগর-বন্দরের একটি চীর-চেনা সংস্কৃতি। দেশীয় যান জট উত্তরণ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে কত ব্যক্তি খ্যাতিমান হয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। তড়িৎ যান জট সমাধানে কাজ করতে গিয়ে কত মামুলী মানুষ বেঘোরে কোটিপতি হয়ে গেছেন তারও কোনও হিসাব-নিকেশ নেই। এই যান জটের কারণেই ঢাকা এখন ওভার ব্রিজের শহর। উড়াল সেতু, পাতাল ট্রেন, মটর সাইকেল সার্ভিস, হেলিকপ্টারে ব্যক্তিগত ভ্রমণের মতো উন্নত চিন্তা মাথায় আসছে কিন্তু এই যানজটের কল্যাণেই! যান জটের কারণেই তো ক্ষমতাবানেরা রাস্তার উল্টো পথে গন্তব্য চলে অফিসের কাজকে করেছেন সাবলীল, নগর জীবনের উন্নয়নের চাকাকে রেখেছেন গতিময়! আর্মড ব্যাটেলিয়ন পুলিশের ডাণ্ডা এখন ট্রাফিক পুলিশের হাতকে করেছে দৃঢ়। জীবনের এই নান্দনিকতা একমাত্র যান জটের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
নাগরিক জীবনে প্রতিটি মানুষকেই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। কাজে যাওয়া-আসার চক্রেই এই জীবন চক্র আটকে রয়েছে। পল্লীগীতির সুর ছড়িয়ে, পায়ে হেঁটে চাকরীস্থলে যাবার দিন সেই বহুবছর আগেই শেষ হয়ে গেছে; যখন কিনা হাতির ঝিলে হাতিরা সাঁতার কাটত। গায়ে বাতাস লাগিয়ে ফুরফুরে মেজাজে পায়ে হেটে কর্মস্থলে যাওয়া তো এখন রূপকথার গল্পের মতো অলিক ব্যাপার।
ঢাকা এখন ফাঁকা নেই। চারিদিকে গিজগিজ করছে ব্যস্ত-ত্রস্ত মানুষ। ফুট পাতে পা রাখার জায়গা নেই। হাঁটতে গেলে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়। যানবাহনেই একমাত্র ভরসা। আর যানবাহনের কথা উঠলেই মনের মধ্যে ভেসে উঠে যানজটের কথা। এসব যানের বাইরেও জট, ভিতরেও জট। জট হলে কি হবে? এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে জনগণের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি। স্বভাবতই যানজটের এই সুবিধা তিনিই উপলব্ধি বা ভোগ করতে পারবেন যিনি নিয়মিত যানে চড়ে যাতায়াত করেন। নিন্দুকেরা এর নানাবিধ নেতিবাচক দিক প্রচার করলেও এর ইতিবাচক দিকগুলো তারা এড়িয়ে যান। তাই যানজটের বহুমুখী গুণের কথাগুলো ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমজীবীসহ প্রতিটি নাগরিকের জানা অতীব জরুরি।
যানজটের ইতিবাচক দিক:
যানজটে রয়েছে সাহিত্য চর্চার অবারিত সুযোগ! সাহিত্যিকদের সাহিত্য রচনার জন্য দরকার লেখার উপাদান। যানজটে আটকা-পড়া গাড়ির মধ্যে বসে একজন লেখক, একটু ভিতরে-বাইরে তীক্ষ্ণ নজর দিলেই সাহিত্য লেখার জন্য অগণিত উপাদান পেয়ে যাবে। গাড়ির ভিতরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, ভাষা এবং ব্যবসায়িক প্রচারণা দেখে একজন চতুর লেখক, সাহিত্য তৈরির অনেক উপজীব্য খুঁজে পাবেন। শুধু দরকার, এসব চিত্র চিন্তায় গেঁথে রাখা, আর বাসায় গিয়ে ঝটপট লিখে ফেলা। মনে রাখা দরকার পৃথিবী বিখ্যাত বহু সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছে কিন্তু এই চির-চেনা জন দুর্ভোগ নিকটে দাড়িয়ে অবলোকন করার মাধ্যমেই।
যানজট শুধু সাহিত্য রচনারই দ্বার উন্মুক্ত করে না বরং সাহিত্য পড়া ও গবেষণার ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। যানজটের অবসর সময়টাকে বই পড়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এমন হট্টগোলের মাঝে যদি একবার পড়ায় মনোযোগী হবার অভ্যাস রপ্ত করা যায়, তাহলে তো কোনও কথাই নেই। যখন তখন, যেখানে সেখানে, যে কোনও পরিস্থিতিতেই তিনি অনায়াসে মেডিটেশনের কাজ সেরে ফেলতে পারবেন! মেডিটেশনে অভ্যস্ত হতে মানুষ প্রতিনিয়ত কত কসরত করে। যানজটের এই অভ্যাসে চালাক মানুষের সেই দুঃচিন্তাও লাঘব হবে।
যানজট যেমন ব্যক্তিকে সাহিত্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ করবে, তেমনি নিরস মানুষকে পড়ায় মনোবিবেশ ঘটাবে। গাড়ির ভিতরে যে সমস্ত উপদেশ বানী ও দিক নির্দেশনা লেখা থাকে; তা পড়ে ও অনুধাবন করে যে কেউ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। গাড়ীর ভিতরে লিখিত জনপ্রিয় সেরা সেরা উপদেশ বাণী, ‘৫০০ টাকার ভাংচি নাই’, ‘পকেট সাপধান’, ‘অপরিচিত থেকে কিচু খাইপেন না’, ‘ভদ্রতা ভংশের পরিচয়’, এসব পড়ে চক্ষু খাড়া হবে কেননা এই লেখা গুলো প্রায় ভুল বানানে ভরপুর। কিন্তু পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য এ কথাগুলোই যথেষ্ট। বিজ্ঞ লোকেরা হয়তো এগুলো পড়ে কিছুটা ইতস্তত বোধ করবে কিন্তু মনের মধ্যে রসবোধ লুকানো মানুষ গুলো প্রাণ উজাড় করা অট্টহাসি দিয়ে, ফুসফুসের মলিন বাতাস বের করে দিতে পারবে। তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এতে করে নিস্তেজ যাত্রীর বিষণ্ণ মনটা প্রফুল্লতায় ভরে উঠবে।
যানজটে আটকা পড়া মানুষের আরেকটি সুযোগ হলো, ফেসবুকে জীবন ঘনিষ্ঠ স্ট্যাটাস দেয়া। বেকার বসে থাকতে থাকতে মেজাজ যখন তিরিক্ষি হবে, তখন সেটা নিয়ে লিখে ফেলা যায় একটি বিদ্রোহী স্ট্যাটাস। অল্পদিনেই পেয়ে যেতে পারে হিরু আলমের মতো সুখ্যাতি। এটা না পারলে, বিভিন্ন স্টাইলের ‘সিটপি’ পোস্ট করা যেতে পারে। অনেকেই হয়তো সিটপি’র সাথে পরিচিত নন। গাড়ির সিটে বসে, মুখাবয়বে প্যারালাইসিস রোগীর মতো ভেংচি ভাব এনে ফটো তোলাকে ‘সিটপি’ বলে। বন্ধুরা লাইক দিয়ে স্ট্যাটাস ভরে ফেলবে। আরো, আরও ছবি চাইবে, আরও বেশি লাইক আসবে। অল্প দিনেই হওয়া যাবে সেরা ফেসবুক সেলিব্রেটি।
যান জটে নিরুপদ্রব একটি লম্বা ঘুম দেওয়া যেতে পারে। বাড়িতে হয়তো বউয়ের বকবকানি, বাচ্চা কাচ্চার কিচমিচানি, টিভিতে হিন্দি সিরিয়ালের কুটনামির হিসহিসে হাঁসি, নাটকের উচ্চ ভলিউমের শব্দ, পাশের বাসার জন্মদিনের পার্টি উপলক্ষে হাই ভোল্টেজ ডিজে গানের ঝাঁকুনি, গলির পাশের বেজায় স্বাধীনতা প্রাপ্ত বিক্ষুব্ধ কুকুরের ঘেউ ঘেউ; শব্দের কারণে ভালোভাবে ঘুমাতে পারা যায় না। তাই যানজটে এসকল ঝামেলা মুক্ত হয়ে ফ্রেস একটা ঘুম দেওয়া যায়! এখানে হরেক রকম হর্নের শব্দে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। এজন্য নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে একটু পরিবর্তন করতে পারলে, দেখা যাবে হর্নের শব্দও বাঁশির সুরের মতো মধুর মনে হচ্ছে। গভীর ঘুমে হয়তো স্টেশন মিস হতে পারে কিন্তু এটা আমাদের দেশে তো বড় কোন সমস্যা না! অফিসের বসকে ফোন করে বলে দিলেই তো হল, যানজটে আটকা পড়েছি। ব্যাস, কর্ম খতম! কেননা, তিনিও তো জট-ময় শহরেরই বাসিন্দা।
যানজটে দর্শন চর্চাও করা যেতে পারে। বাসে দাঁড়িয়ে নিজেকে অটো-সাজেশন দিতে দিতে অনাবিল সীমাহীন কল্পনার জগতে ডুব দেওয়া যায়। এতে করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টের ব্যথার কিছুই মনে থাকবে না। এই ফাঁকে পকেটমার পকেট ফাঁকা করে দিলেও সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মনের ভেতর যে অনাবিল আনন্দ আর অফুরন্ত প্রাণশক্তির সৃষ্টি হবে তা হারানো টাকার চেয়েও কোন অংশে কম নয়।
যানজট মানুষকে ধৈর্যশীল ও সহনশীল বানায়। যান জটে থাকুক আর ঘাটে থাকুক এই যানে করেই গন্তব্যে যেতে হয়। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই, এর থেকে নিস্তারও নেই। সার্বক্ষণিক এই ভাবনা যাত্রীকে সহনশীল করে তুলবে। এই বিস্তর সহ্য ক্ষমতা পারিবারিক কটূক্তি ও ঝুট-ঝামেলাকে উপেক্ষা করতে শিখাবে। এভাবে দৈনিক দীর্ঘক্ষণ, দীর্ঘদিন যান জটের কবলে থাকতে থাকতে দেহ-মনের সকল স্নায়ু অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। ফলে বাকী জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাত্রীরা আরও বেশি চাপ নিতে পারবে। কোন অবস্থাতেই তিনি নেতিয়ে পড়বেন না। মানসিক ধৈর্য তাকে অটুট ও আস্থাশীল করে রাখবে। তিনি একজন পরিক্ষিত ধৈর্যশীল ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারবেন। শেষ মেষ গৃহিণী পর্যন্ত ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বলতে বাধ্য হবে, ‘ তোমার সমুদয় অনুভূতি কি যানজটেই রেখে এসেছ?
কবি হওয়া, গায়ক হওয়া, চিন্তাশীল সাংবাদিক কিংবা হুমায়ুনের হিমু হওয়া সহ যানজটের আরও বহু ইতিবাচক দিক রয়েছে। নিন্দুকেরা সর্বদা যানজটের নেতিবাচক দিক গুলোই উল্লেখ করে থাকে। মানুষ হিসেবে যদিও নেতিবাচক দিকগুলো বাদ দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোই বেশি বেশি ভাবা উচিত। কিন্তু একটি জিনিষের শতভাগ ইতিবাচক সফলতা ভোগ করতে গেলে, তার নেতিবাচক দিক সম্পর্কে অন্তত মামুলী জ্ঞান থাকা দরকার। সে হিসেবে যানজটের নেতিবাচক দিক সম্পর্কে না জানলে, ভদ্র-যাত্রীরা কদাচিৎ বিড়ম্বনার শিকার হতে পারেন। সে সবের কয়েকটির কিঞ্চিত নমুনা তুলে ধরা হল।
যান তথা গাড়িতে উঠে দাঁড়ালেন তো কনট্রাকটরের তাড়া। ভাই পেছনের দিকে আগান, পেছনের দিকে আগান! এখন তার কথার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আপনি যদি বলেন,‘ স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছি সামনের দিকে আগানোর জন্য; পেছনে আগানোর জন্য নয়! স্বাধীনতার পর থেকে ঐ যে পেছনের দিকে আগানো শুরু করেছি; পেছাতে পেছাতে এখন পুরো জাতির অবস্থান আগায় আছে না পাছায় আছে, তা বুঝা বড় দায়! একদিকে যানজটে যাত্রীদের অবস্থা টালমাটাল আর অন্যদিকে দলীয় কর্মীরা নেতাদের গন-সংবর্ধনা দেয় রাস্তা বন্ধ করে! রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিবাহের আয়োজন, ধর্মীয় উৎসবের কথা নাই বা বলা হল। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে গেলে, গায়ের শার্ট-প্যান্ট যথাস্থানে থাকবে কিনা, সেই সন্দেহে সদালাপী মানুষ চিন্তায় পড়ে।
মাহমুদ সাহেব তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সিটে বসে আছেন। এমন সময় পেছনে আগানো যাত্রীদের একজন তার মুখের সামনে আরাম করে দাঁড়িয়ে, উপরের হাতল ধরার জন্য সযত্নে হাতখানা তুললেন। আর যায় কোথায়! ভদ্রলোকের বগলের সিন্দুক খুলে, একপশলা দম বন্ধকরা ঝাঁঝালো ঘ্রাণ, ঠিক কুলি করার মতই মাহমুদ সাহেবের নাকের উপরে আছড়ে পড়ল! অপ্রত্যাশিত হাওয়ার উপস্থিতিতে আচমকা ধড়-ফরিয়ে উঠলেন তিনি। কোনও কিছু বুঝে উঠার আগেই তাঁর হাতের দুটো আঙ্গুল নিজের নাকের ছিদ্র দুটো চেপে ধরলেন! মিহি তন্দ্রাভাব মুহূর্তেই জটের মাঝেই পালাল; উপরন্তু এই কটু দুর্গন্ধের ঢেউ সামলিয়ে একটি ফ্রেশ শ্বাস নেয়াই যেন অসম্ভব হয়ে উঠল।
বাতেন মিয়া পরিবার নিয়ে শহরে ঢুকেই ‘যান জটে’ আটকা পড়েছেন। দীর্ঘক্ষণ ধরেই স্ত্রীর বমি বমি ভাব। এসেও আসেনা, গিয়েও যায় না, এমন দশা। দম বন্ধ করা আবদ্ধ পরিবেশে ঠিকতে না পেরে অজানা পথিক আধা প্যাসকেল পরিমাণ উদরস্থ বায়ু ছেড়ে হাঁফ ছাড়লেন! উদরস্থ বায়ু নির্গমনের পথ আর বসা যাত্রীর নাকের উচ্চতা তো প্রায় একই! তাই এ কাজে সাথে সাথেই তাজা একশন বুঝা যায়। একসাথে সবাই চিল্লিয়ে উঠল! কে করল রে এই আকাম! আকল-শরম নাই নাকি? কেউ গালি দিলেন, তোমার গোত্রে ভদ্র মানুষ নাই? বেতমিজ, বেশরম কোথাকার!
গালি আর তিরস্কার যাই দেয়া হউক না কেন। নিজের পেটের উপর আস্তা কেউ রাখতে পারেনা। বিশ্ব-সুন্দরীও যদি এ কাম করে, দুর্গন্ধ ছড়াবেই! তাছাড়া চলন্ত গাড়ি হলে কিছুটা হাঁফ ছাড়া যেত, গাড়ী চলাচলের ফাঁকে ঘুরপাক খাওয়া অসহ্য বাতাস হয়ত এক-ফাঁকে বিতাড়িত হতো। বাতের মিয়ার পরিবার গাড়ীতে এবং তা যান জটে আবদ্ধ! বাতাস চলাচল একেবারেই বন্ধ, এদিকে আবদ্ধ দুর্গন্ধ যাত্রীদের নাকে নাকে মহড়া দিচ্ছে। বাতেনের পরিবার আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। ‘ওয়াক’ করে আধা বালতি পরিমাণ বমি নির্গমন করে হাফ ছাড়লেন! পরিবেশ বিপর্যয়ের নতুন রূপ ধারণ করল; এতক্ষণ তো ছিল একতরফা গন্ধ, এখন উদরস্ত বায়ু আর বমির দ্বিপাক্ষিক ধন্ধে বাকি যাত্রীদের মরি মরি অবস্থা!
পাশের যাত্রীর শরীরের ঘামের দুর্গন্ধ, পেছনের যাত্রীর নাসিকা গর্জন, কনট্রাকটরের মুখের বিশ্রী বাতাস, সামনের যাত্রীর সিগারের কড়া ঘ্রাণ, গাড়ির নির্গত কালো ধোঁয়া, রাস্তার উড়ন্ত বালি, ড্রাইভারের বদ মেজাজ, পকেট মারের উৎপাত, ক্যানভাসারের চিল্লানী, ভিক্ষুকের ত্যক্ততা, অসভ্য যাত্রীর বিশ্রী শব্দ, অপরিছন্ন যাত্রীর অনাহুত স্থানের চুলকানি-খাউযানীসহ আরও বহু অপ্রীতিকর ঘটনার সাথে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে যাত্রীদের মোলাকাত করতে হয়। পড়তে হয় নানান বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। এই ঘটনাগুলো আপাত দৃষ্টিতে খারাপ মনে হলেও এগুলোই কিন্তু যাত্রীকে কষ্ট সহিষ্ণু হিসেবে গড়ে তোলে। দীর্ঘ বছর ধরে জটে পরে ঠ্যালা-ধাক্কা খেতে খেতে জাতির বৈশিষ্ট্যে ধৈর্য আর সহ্য ক্ষমতা প্রবল হয়েছে। তাই এই যানজট শহরবাসী তথা বাঙালি জাতিকে করেছে পরিশ্রমী এবং একে অপরের গায়ের মোলায়েম গন্ধ বিতরণে হয়েছে সহনশীল! তাই শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে আমাদের এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করা উচিত।
Discussion about this post